ছবি: সংগৃহীত।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদ ইসলামের প্রাচীন সমৃদ্ধশালী শহর ছিল। দজলা নদীর তীরবর্তী শহরটি দ্বিতীয় আববাসীয় খলিফা আল-মানসুর (১৩৬-১৫৮হি.) ১৪৪ অথবা ১৪৬ হিজরিতে নির্মাণ সমাপ্ত করেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৯৬-৯৭)
সে সময় একে মদিনাতুস সালাম বা শান্তির শহর বলা হতো। তখন থেকে অদ্যাবধি এটি রাজধানী শহর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত আছে। বাগদাদ শুধু নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর দালান-কোঠার অবকাঠামোগত বৈচিত্র্যময় নিপুণতার জন্য বিখ্যাত নয়, বরং এটি শিক্ষা নগরী হিসাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞান সাগরে অবগাহনের জন্য আসত। এই শহরেই ৪৫৯ হি./১০৬৬ খ্রি. সর্বপ্রথম উচ্চ শিক্ষার অনন্য প্রতিষ্ঠান নিযামিয়া মাদ্রাসা, সেলজুক সুলতান আল্প আরসালান (মৃ. ৪৬৫ হি.) ও মালিকশাহ (মৃ. ৪৮৫ হি.)-এর চৌকষ মন্ত্রী নিজামুল মুলক তুসি (মৃ. ৪৮৫ হি.)-এর হাত ধরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সে সময় ইসলামী বিশ্বের একদিকে বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় খেলাফত ও মিসর কেন্দ্রিক ইসমাঈলী শিয়াপন্থী ফাতেমীয় খেলাফত এবং অপরদিকে পারস্যের ইসফাহান কেন্দ্রিক সেলজুক তুর্কী সালতানাতের রাজত্ব কায়েম ছিল। আব্বাসীয় খেলাফতে যেমন সেলজুকদের ব্যাপক প্রভাব ছিল তদ্রূপ এই দুই সাম্রাজ্যের ওপর শিয়া মতালম্বীদের সর্বাত্মক আধিপত্য ছিল। ইসলামী সাম্রাজ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে বিভিন্ন সময়ে কারামতি, রাফিজি, ইসমাঈলি বাতিনী ও হাশাশিনি শিয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা, ভ্রান্ত আকিদা প্রচারসহ মুসলিম বিশ্বের বহু আলেম, মুজাহিদ ও নেতাদের গুপ্ত হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিল।
বছরার আল-কাতিফে সংগঠিত হওয়া কারামতি শিয়া গোষ্ঠীর নেতা আবু সাঈদ আল-জানাবি ২৮৬ হিজরিতে আব্বায়ীয় খলিফা মুতাদিদ (মৃ. ২৮৯ হি.)-এর রাজত্বকালে আত্মপ্রকাশ করে সর্বত্র নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ৩১৭ হিজরিতে হজ চলাকালীন ৮ই জিলহজ কারামতিরা পবিত্র মক্কা নগরী অবরোধ করে কাবার ভিতরে বহু হাজিদের নির্মমভাবে হত্যা করে জমজম কূয়ায় ফেলে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল পানি দূষিত করে যমযমের পবিত্রতা নষ্ট করা। তাদের আমির আবু সাঈদের ভাই আবু তাহির কাবার দরজায় বসে ছিল। তার পাশেই পবিত্র শহরে, পবিত্র মাসে, পবিত্র দিনে মসজিদুল হারামে তলোয়ার দিয়ে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিল। সেই কাফের তখন বলেছিল, ‘আমিই আল্লাহ, আল্লাহর শপথ আমি, আমি সৃষ্টি জগত সৃষ্টি করি এবং আমিই ধ্বংস করি’ (নাউজুবিল্লাহ!)। এমনকি এই পথভ্রষ্টরা জান্নাতি পাথর হাজারে আসওয়াদকে কাবার দেয়াল থেকে উপড়ে ফেলে ইয়ামনে নিয়ে যায়। দীর্ঘ ২২ বছর পর ৩৩৯ হিজরিতে তারাই সেটি বিপুল অর্থের বিনিময়ে ফেরত দেয়। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/১৬০-১৬১)
৪৫০ হিজরিতে তত্কালীন আব্বাসীয় খলিফা কায়িম বি-আমরিল্লাহ (মৃ. ৪৬৭হি.)-কে ক্ষমতাচ্যুত করে বাগদাদ দখলে নেয় আব্বাসীয়দের এক সময়ের বিশ্বস্ত সেনাপতি রাফিজি নেতা আল-বাসাসিরি (মৃ. ৪৫১ হি.)। মূলত সে ফাতেমীয় শিয়া খলিফা মুসতানছির বিল্লাহ (মৃ. ৪৮৭ হি.)-এর প্রতি আনুগত্যশীল ছিল। বিধায় বাগদাদ দখলের পর খলিফাকে কারাবন্দি করে এবং ফাতেমি খলিফার নামে খুতবা পাঠের আদেশ জারী করে। অধিকন্তু ইরাকের সব শহরে আযানের বাক্য পরিবর্তন করে ‘ভাল কাজের দিকে এসো’ বাক্য সংযুক্ত করে প্রচার করা হয়। অতঃপর ৪৫১ হিজরিতে সেলজুক সুলতান তুগরুল বেগ (মৃ. ৪৫৫ হি.) আল-বাসাসিরিকে হত্যা করে বাগদাদে আব্বাসীয় খিলাফত পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে সহযোগিতা করেন এবং তিনি নিজেও খলিফার আনুগত্য স্বীকার করেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/৭৮,৮৩)
বাতিনীরা স্বীয় মতাদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি এমনই উন্মাদ প্রকৃতির আনুগত্যশীল ছিল।
উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে ইসলামী সাম্রাজ্যে শিয়াদের নগ্ন আগ্রাসনের সুদূরপ্রসারী ধ্বংসাত্মক প্রভাব বুঝতে পেরে তুর্কী সুলতান আল্প আরসালানের সময়ে বিদ্যানুরাগী মন্ত্রী নিজামুল মুলক বাগদাদে নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে বাতিনী শিয়াদের ইসলাম বিধ্বংসী মতবাদ রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং তাদের মতবাদের মূলোত্পাটন করতে হলে মানুষের আকিদার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ইসলামী শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত আক্বীদা শিক্ষা দিতে হবে এবং এই ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন করে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সেজন্য তিনি বাগদাদে প্রথম নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর সেযুগের বিজ্ঞ পণ্ডিতদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। স্বয়ং ইমাম গাজালি (মৃ. ৫০৫ হি.) বাগদাদে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং বাতিনি মতবাদের বিরুদ্ধে মূল্যবান গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। নিজামুল মুলক শুধুমাত্র বাগদাদ নয় বরং বালখ, নিশাপুর, হেরাত, ইছফাহান, বছরা, মার্ভ, তাবারিস্তান, মছুল, ইরাক ও খোরাসানের প্রত্যেক শহরে একটি করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন যেগুলো নিযামিয়া মাদ্রাসা নামে খ্যাত ছিল। [(মুহাম্মাদ সাহেল শফীক, জামেয়া নিযামিয়া (বাগদাদ) কা ইলমি ওয়া ফিকরি কেরদার (২৫৬-৪৫৭ হি.) ইয়ে এক তাহকিকি জায়েজা (করাচী : করাচী বিশ্ববিদ্যালয়, পিএইচ.ডি থিসিস ২০০৯ খ্রি), পৃ. ১৪৩]
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
