ছবি: সংগৃহীত।
ইরানে পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হবে আগামীকাল ২১ মার্চ। পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন হবে ২০ মার্চ। শুক্রবারের পরদিন থেকে শুরু হবে ছুটি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে এই খবর বলা হয়েছে। আর ইরানের প্রাচীন নববর্ষ উৎসব নওরোজ। এই উৎসবকে সামনে রেখে সাধারণত দেশজুড়ে উৎসবের প্রস্তুতিও থাকে তুঙ্গে।
এ বিষয়ে তেহরানের উত্তর-পূর্বে দামাভান্দে বসবাসকারী ৫০ বছর বয়সী মিনার বলেন, ‘আমরা সাধারণত ঘর পরিষ্কার, নতুন কাপড় কেনা, মিষ্টি ও নাস্তা কেনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম।’ কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, চোখে পানি নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ বছর? প্রতিদিনই অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। সময়ের হিসাবই হারিয়ে ফেলেছি।’
নওরোজ অর্থ নতুন দিন, বসন্তের সূচনা এবং নতুন বছরের সূচক হিসেবে উদযাপিত হয়। ৩ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এই উৎসবটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন উৎসব।
এ বছর ২০ মার্চ নওরোজ উদযাপিত হচ্ছে, আর পরের দিন শুরু হবে ইরানি নতুন বছর। তবে এ বছরের নওরোজ অনেকের জন্যই যুদ্ধের মধ্যে প্রথম উদযাপন।
তেহরান ছেড়ে পরিবারসহ দামাভান্দে এসেছেন মিনার ছেলে আমির। তিনি বলেন, ‘এই নওরোজ একেবারেই আলাদা লাগছে। যুদ্ধের কারণে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা দেশের অবকাঠামো নিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অবস্থায় হয়তো ইরানের খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। আমি চাই না এটিই আমাদের শেষ নওরোজ হোক।’
ইরানিদের কাছে নওরোজ তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। পারসিয়ান, পারসি, কুর্দি, আর্মেনিয়ান, আজারবাইজানি, তাজিক, কাজাখ, উজবেকসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এই উৎসব উদযাপন করে।
সর্বশেষ ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে এমন পরিস্থিতিতে নওরোজ উদযাপন করা হয়েছিল।
নওরোজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা হলো ঘর পরিষ্কার করা, যাতে পুরনো বছরের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে নতুন বছরের সূচনা হয়।
মিনা বলেন, ‘নতুন বছর শুরু হলে টিভিতে উৎসবের ঘোষণার শব্দের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের শব্দ মিশে যাবে কিনা জানি না, তবে আশা করি না।’
সাধারণত দুই সপ্তাহব্যাপী ছুটিতে পরিবার-পরিজন একে অপরের বাড়িতে যায়।
তবে অনেকেই তেহরানে ফিরতে চাইছেন না, কারণ সেখানে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে।
মিনা বলেন, ‘এ বছর দেখা-সাক্ষাৎ খুবই সীমিত। আমরাও তেহরান ছেড়ে তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় এসেছি।’
তিনি বলেন, ‘ইচ্ছে করে সবকিছু যেন খারাপ স্বপ্নের মতো মুছে যায়।’
সাধারণত নওরোজের আগে বাজার, শপিংমল ও রাস্তাঘাট ভিড়ে জমজমাট থাকে। কিন্তু এবার সেই চিত্র নেই।
তেহরানের পারমিস বলেন, ‘আগে নওরোজের জিনিসপত্র সহজে পাওয়া যেত। এখন বাইরে গেলেই ভয় লাগে—বিমান হামলায় পড়ব কিনা।’
তিনি বলেন, ‘সবকিছুর মধ্যেও কেউ কেউ আগের মতোই চলার চেষ্টা করছে। আমি সেলুনে ছিলাম, তখন বড় বিস্ফোরণ হলো, কিন্তু কেউ ভয় পায়নি।’
আরেক বাসিন্দা মারিয়াম বলেন, অনেকেই এখনও ‘হাফত সিন’ সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ ফুল কিনছে, রাস্তার বিক্রেতাও আছে। তবে আগের মতো নয়। তবুও এটি আমাদের বার্ষিক ঐতিহ্য, তাই উদযাপন করতেই হবে। আমি কিছু জিনিস কিনেছি, কাল হাফত সিন সাজাবো।’
তবে দেশের ভেতরে এমন মানুষও আছেন যারা যুদ্ধ চলার পক্ষেই মত দিচ্ছেন।
তেহরানের রামতিন বলেন, ‘নওরোজের কী দরকার? ইসলামিক রিপাবলিক থাকলে কষ্ট চলতেই থাকবে। এবার এই শাসনের শেষ হওয়া উচিত।’
আরেকজন কিয়ান বলেন, ‘আমার মা বলেন, এই শাসন চলে গেলে ঘর ভেঙে পড়লেও সমস্যা নেই। আমরাও তাই মনে করি। সবকিছু ভেঙে পড়লেও সমস্যা নেই, এই শাসন যেতে হবে। আমরা নওরোজ নিয়েও ভাবছি না, হাফত সিনও সাজাইনি।’
নওরোজ শীতের অবসান ও বসন্তের সূচনার প্রতীক। মানুষ সাধারণত নতুন বছরে সুস্বাস্থ্য, সুখ ও নতুন শুরুর প্রত্যাশা করে।
তবে তেহরানের শিরিন বলেন, ‘যুদ্ধের মধ্যে নওরোজ আসায় আরও খারাপ লাগছে।
তিনি বলেন, ‘দোকান খোলা আছে, কিন্তু বাতাসে নওরোজের সেই গন্ধ নেই।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যে রয়েছে ইরান।
ইরানের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন হিউম্যান রাইট অ্যাক্টিভিস্ট জানিয়েছে, ইরানে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ১১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৪ জন বেসামরিক নাগরিক এবং অন্তত ২০৭ জন শিশু।
এর জবাবে, তেহরানও ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
