× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

সামাজিক সমস্যা সমাধানে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকা

ইলিয়াস হোসেন রানা

১৪ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৫৫ এএম

দেশে দেশে যুগে যুগে নিত্যনৈমিত্তিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। মানবতার জাগরণ, স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা দান, দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সাপেক্ষে গণআন্দোলন, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে নতুন সংযোজন- প্রতিটি ক্ষেত্রে সাহিত্য তার গভীর অবদান রাখতে সমর্থ। বাংলাদেশের সমাজ জীবনে আমরা সামাজিক অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করছি বহুদিন ধরে। অতীতের আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থাই ছিল এর অন্যতম কারণ। ব্রিটিশ শাসন এ দেশে সমাজভিত্তিক, ভাষাভিত্তিক, গোত্রভিত্তিক যে শ্রেণিগত বৈষম্য সৃষ্টি করে গেছে তা আজও সমাজের প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় তার সাহিত্য সংস্কৃতির মধ্যে বিধৃত। সাহিত্য-–সংস্কৃতি দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে। সাহিত্যের প্রয়োজন ব্যক্তির মানসিক উৎকর্ষের জন্য, সমাজ ও গণজাগরণের জন্য, সমাজের জন্য। সাহিত্য সংস্কৃতি শুধু ভাবের জন্য নয়-মানব কল্যানের জন্য।  

ঐতিহাসিক কাল থেকে বাঙালি লেখকরা লোক-গীতি, লোক-গল্প, রূপ-কাহিনি, নাটক, কবিগান, জারিগান, যাত্রাগানসহ বিভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে গণমানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা ও দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের ও তৎকালিন শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন করেছেন। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে, যার সঙ্গে কবি সাহিত্যিকরা সরাসরি জড়িত। কবি সাহিত্যিকগণ প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও গণমানুষের অতি নিকটে থেকে তারা তাদের মধ্যে দেশাত্ম ও জাতীয়তাবোধ এবং প্রগতিবাদী আন্দোলনের জোয়ার জাগিয়ে তুলতে পারেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার বিপ্লবাত্মক ক্ষুরধার লেখনির দ্বারা যেমন গণমানস কে উদ্বুদ্ধ করেছেন তেমনি উৎখাত করতে সহযোগিতা করেছেন। স্বৈরতন্ত্র  ও সকল রকমের সামাজিক অত্যাচার ও উৎপীড়ন। হিন্দু সমাজের নিপীড়ন, বঞ্চনা, নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে লিখছেন শরৎ চন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে গভীর হিন্দু জাতীয়তাবোধ ও আর্দশ সুন্দরভাবে শিল্পরূপের মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে সেই সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে মানব হৃদয় রহস্যের জঠিল বিষয়। দীনবন্ধু মিত্রের “নীলদপর্ন” রচনার মধ্যে ছিল ব্রিটিশের অত্যাচার, প্রাচিন পন্থীদের স্বার্থপরতা ও ভণ্ডামীর কথা। রবিঠাকুরের হাতে রচিত হয় বিচিত্র গীতিকবিতা। 

প্রত্যেক জাতির কল্যান ও অগ্রগতির জন্য সাহিত্য-সংস্কৃতির অবদান যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বলা বাহুল্য। জাতির দুঃসাহসী জীবন ধারায় সাহিত্য জোগায় শান্তি ও অনুপ্রেরণা। কবি সাহিত্যিকগণ প্রেমিক, মানবতাবাদী ও দেশহিতৈষী এই মানবপ্রীতি ও দেশপ্রেম দেখতে পাই উনবিংশ শতাব্দীর আরও একজন সাহিত্য পুরুষ কবি আব্দুল হাকিমের কবিতায় তিনি লিখেছেন-

“দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়”

   নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।”

মানব জীবনে মাতৃভাষা যে কতখানি স্থান দখল করতে পারে তা বর্ণনাতীত। মাতৃভাষা প্রত্যেকটা জাতির অমূল্য সম্পদ। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি জাতীয়বাদের উন্মেষ ঘটে। ভারত বিভাগের পরে পাকিস্তানী শাষক গোষ্ঠী সর্বপ্রথম পূর্ব-পাকিস্তান জনগণের উপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হিসাবে উর্দু চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয় তা বাঙালি জাতি দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করতে সামর্থ্য হয়। বাংলা ভাষার জন্য যদি বাঙালি জাতি আন্দোলন না করতো তবে হয়তো আমরা স্বাধীনতাও পেতাম না। কারণ ভাষার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের মধ্যে যে জাতীয়তাবোধের জন্ম হয় তার মধ্যে নিহিত ছিল স্বাধীনতার বীজ। ঊনবিংশ শতক থেকে যতগুলো প্রগতিবাদী সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তার মধ্যে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ছিল বলেই রাজনীতি ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আসে আমাদের স্বাধীনতা। পঞ্চম দশক থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত মানুষের মনে দেশাত্মবোধের যে সূচনা হয়েছিল তার মূল কারণ ছিল সে সময়ের লেখকদের বিল্পবাত্মক লেখনি। পৃথিবীর যতগুলো দেশে স্বাধীনতা এসেছে সব দেশেই স্বাধীনতার পরবর্তীকালে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। চীন, জাপান, রাশিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিপ্লব হয়েছে যা সমাজ বদলের হাতিয়ার। যতক্ষণ পর্যন্ত এ বিপ্লব সংঘটিত করা সম্ভব হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সামাজিক সমাস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। একটা জাতির চেতনাকে সচেতন করতে হলে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উন্নয়নই একমাত্র পথ-একমাত্র পন্থা। 

মানুষের যদি খাদ্য সমস্যা, বস্ত্র সমস্যা, বাস গৃহের সমস্যা না থাকতো তাহলে মানুষ দিব্যি গাছতলায় বসে কোথাও এক পা না বাড়িয়ে আলস্যে তন্দ্রায়-আরামে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু মানুষের ক্ষুধা আছে, যৌন তাগিদ আছে, তার দেহ ও মনের বিচিত্র পিপাসা আছে; আছে লোভ, লালসা, কামনা, বাসনা, স্বপ্ন ও কল্পনা; আছে তার অনুভূতি, উপলব্ধিবোধ ও চেতনা। আর এসবের জন্য তার আছে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না। মানবজাতির এ সকল বিচিত্র ক্ষুধা ও পিপাসা তাকে জড়তা থেকে, নিশ্চলতা থেকে জোর করে বের করে নিয়ে এসে ভাল-মন্দ কাজে নিজেকে সম্পূক্ত করে এবং ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা তৈরি করে। মানুষ যেমন বৈচিত্র্য সমস্যার সৃষ্টি করে তেমনি সমাধানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা থেকে সভ্যতা গড়ে তুলেছে; সে প্রমাণ করেছে সে মানুষ; সে প্রমাণ করেছে পৃথিবীতে আল্লাহর সকল সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি মানুষ। মানুষ তার জীবনের সকল সমস্যা সমাধান চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে করে থাকে। যারা এই চিন্তার ভূমিকা পালন করেন সাহিত্যিকরা তাদের মধ্যে অন্যতম। সাধারণত চিন্তার ভূমিকা পালন করেন রাজনীতিকরা, দার্শনিকরা, অর্থনীতিবিদরা বিজ্ঞানীরা, বুদ্ধিজীবীরা, ধর্মবিদরা, সমাজবিজ্ঞানীরা এবং সাহিত্যিকরা। কিন্তু একার্থে যদি আমি বলি চিন্তার কাজটা কেবল সাহিত্যিকরা করেন তাহলে সেটা ভুল হবে না। কারণ যে কোন চিন্তা তা যখন অক্ষর, শব্দ, ভাষা ও বাক্য রচনার মাধ্যমে রূপলাভ করে তখন তা এক ধরণের সাহিত্য হয়ে যায় এবং সে জন্যই সে রচনা সাহিত্যিকের তা তিনি রাজনীতিকই হোন, বিজ্ঞানীই হোন বা দার্শনিকই হোন। সুতরাং বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানে সাহিত্যের ভূমিকা প্রধান বললে তা অত্যুক্তি হবে না। সাহিত্য মানেই চিন্তা। আর এই চিন্তাই আমাদের সেই প্রধান যুদ্ধ যা বর্তমান সমস্যা সমাধানের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। সে আমাদের দেখাবে স্বপ্ন, জাগাবে আশা, দান করবে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ-শক্তি, সৃষ্টি করবে কথাকে কাজে পরিণিত করার দারুণ উদ্যম। আত্মরক্ষার, আত্মবিজয়ের এবং শত্রু দমন ও শত্রু বিজয়ের প্রতিটি কৌশল সে আমাদের শিক্ষা দেবে এবং কোন নিরাশার কাছে পরাজিত না হওয়ার প্রেরণা ও ইচ্ছা শক্তিকে সে জাগিয়ে দিবে।

বাংলাদেশে আজ তাই যারা সাহিত্যিক আছেন, এই মানসিকতার ভিত্তির উপর তাদের সাহিত্য রচনা করতে হবে। পৃথিবীতে এই মুহূর্তে ইচ্ছা করলেই শান্তি ফিরে আসবে না কিন্তু মানুষের শুভ ও কল্যানকামী চিন্তা যদি অবিরাম সেই লক্ষ্যে মানুষ কে উদ্ধুদ্ধ করতে সচেষ্ঠ হয় ও তাকে প্রেরণা জোগাতে থাকে তাহলে মানুষের আশার এই ইচ্ছার আংশিক পূরণ হতে পারে। বর্তমানে আমাদের আশেপাশে তাকালে আমরা যেসব সমস্যা দেখি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণের, বন্যা, ক্ষরা, স্বাস্থ্য, শস্য ও শিল্প উৎপাদন, শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিল্পোন্নতির সমস্যা এর প্রতিটি সমস্যার সমাধানে সাহিত্যের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু পরোক্ষভাবে তা পারে। কম্যুনিজমের স্বাস্থ্যবৃদ্ধিতে গোর্কির সাহিত্যের ভূমিকা নেই এ কথা কেউ বলবে না। ফ্রান্সের যে রেনেসাঁর উদ্ভব হয়েছিল তাতে রুশো –ভালতেয়ারের সাহিত্যের ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের মানুষের মানসিক শক্তি ও উৎকর্ষে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের সাহিত্য গভীরভাবে সাহায্য করেছে। তাই এ কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে বাংলাদেশের সাহিত্য ও আমাদের প্রতিটি সমস্যা সমাধানে একইভাবে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে। 


লেখক: প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানি ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.