× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

পোশাক খাতের বাইরে: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্সে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

ডেস্ক রিপোর্ট।

১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

ছবি: সংগৃহীত।

গত চার দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রাকে বারবার ফিরে লেখা একটিমাত্র অধ্যায়ের মতো দেখায়; যার শিরোনাম "তৈরি পোশাক শিল্প"। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৫৫.৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারই এসেছে এই খাত থেকে। এর পেছনের মূল বার্তাটি বেশ স্পষ্ট: সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা হয়েছে। তবে এটি শুধু ঝুঁকির বিষয় নয়; পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক দৃশ্যপটে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই।

২০২৬ সালের নভেম্বরে অনুন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের ফলে তৈরি পোশাক খাতের সাফল্যকে ত্বরান্বিত করা বিশেষ সুবিধা এবং শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার—বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যে—সংকুচিত হয়ে আসবে। ইইউ-এর 'এভরিথিং বাট আর্মস' (ইবিএ) সুবিধাটি বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে এবং তার স্থান নেবে জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি+)। তবে এর সাথে যুক্ত থাকবে সুশাসন ও শ্রম অধিকারের কঠোর শর্তাবলী, যা মেনে চলতে তৈরি পোশাক খাত সবসময়ই কিছুটা পিছিয়ে ছিল। এছাড়া সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি। সস্তা শ্রম, যা একসময় বাংলাদেশের মূল শক্তি ছিল, তা ক্রমশ তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। ম্যাককিনসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রভাবেই পোশাক খাতের প্রায় ৫৬ শতাংশ চাকরি হারিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, জনসংখ্যাগত যে লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড একসময় এই শিল্পকে চালিত করেছিল, তা অসীম নয়।

তাই বাংলাদেশ এখন এক দোরাস্তায় দাঁড়িয়ে। অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এখন আর কোনো পছন্দ নয়, বরং এটি জরুরি। এখন মূল প্রশ্ন হলো: কোন পথে এগোতে হবে, এবং এখনই কেন?
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা এবং শিল্প খাতের যুক্তি—সবই নির্দেশ করছে বাংলাদেশকে ইলেকট্রনিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতের দিকে নজর দিতে হবে। তবে কাটিং-এজ বা একদম সর্বাধুনিক চিপ ডিজাইনের জটিল জগতে নয়; বরং সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনের সেই বিশাল মধ্যবর্তী ধাপে, যেখানে বাস্তব কর্মসংস্থান, রপ্তানি মূল্য এবং প্রযুক্তির প্রকৃত হস্তান্তর ঘটে।

পরিবর্তনশীল বিশ্ব: সেমিকন্ডাক্টর ও খণ্ডিত সরবরাহ শৃঙ্খল
ঢাকার নভোথিয়েটারে আয়োজিত ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বিইএআর (বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক্স, এআই অ্যান্ড রোবোটিক্স) সামিট-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এ খাতের বিকাশে সরকার ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করছে।

বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প কেবল একটি বড় ব্যবসা নয়, এটি এখন এক বড় ধরনের বিন্যাস বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ৩০ বছর ধরে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো একদম সঠিক সময়ে ও সঠিক স্থানে উৎপাদনের কৌশল গড়ে তুলেছিল: যুক্তরাষ্ট্র ডিজাইন খাতের নেতৃত্বে, অতিধুনিক "ফ্যাবস" বা চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের আধিপত্য, দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়ন্ত্রণে মেমোরি চিপ, আর অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (এটিপি) খাতের দায়িত্বে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও চীন। এই দক্ষতার ভিত্তি কিন্তু বেশ নড়বড়ে; এখান থেকে এক বা দুটি স্তম্ভ ভেঙে পড়লেই পুরো ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়তে পারে।

তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC)-এর কথাই ধরা যাক। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক চিপের (১০ ন্যানোমিটারের নিচে) প্রায় ৯২ শতাংশই তৈরি করে এই একটি কোম্পানি। কিন্তু তাইওয়ান প্রণালীর বিস্তার কতটুকু? মাত্র ১৮০ কিলোমিটার। তবে কোনো সংঘাত বা অবরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যদি এই প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে পরবর্তী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে অটোমোবাইল, স্মার্টফোন, প্রতিরক্ষা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন অচল হয়ে পড়বে। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের মতে, তাইওয়ানের চিপ উৎপাদন এক বছর বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে ডাউনস্ট্রিম খাতে প্রায় ৪৯০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে—যা কোনো পরোক্ষ প্রভাব হিসাব না করেই এক অবিশ্বাস্য অঙ্ক।

এবার জ্বালানি খাতের দিকে তাকালে প্রণালী সংক্রান্ত হিসাবটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও খনিজ তেলের এক-পঞ্চমাংশের বেশি পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ২০২৪-২৬ সালের ইরান উত্তেজনার সময় এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই প্রণালী বন্ধ হলে জ্বালানির দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। যার প্রভাবে বাংলাদেশকে সম্প্রতি মাত্র চার মাসের ব্যবধানে আমদানির জন্য অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার গুণতে হয়েছে।

সেমিকন্ডাক্টর তৈরির "ফ্যাবস" কারখানাগুলো প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। কেবল টিএসএমসি-ই তাইওয়ানের মোট বিদ্যুতের ৫-৬ শতাংশ ব্যয় করে। কোনো দেশ যদি এই ধরণের কারখানা স্থাপন করতে চায়, তবে কেবল "সস্তা শ্রম" দিয়ে কাজ হবে না। সেখানে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা। এলএনজি টার্মিনাল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিনিয়োগ অনেক পর্যবেক্ষকের ভাবনার চেয়েও দেশকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোও এই ঝুঁকিগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘চিপস অ্যাক্ট’-এর অধীনে ৫২.৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। ইইউ, জাপান ও ভারত—সবাই নিজস্ব চিপ সরবরাহ নিশ্চিত করতে শত শত বিলিয়ন ডলার ঢালছে। বিশ্ব প্রযুক্তির পরাশক্তিগুলো এখন আর কোনো একক অঞ্চলের ওপর চিপের জন্য নির্ভর করতে চায় না। এটি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক বিরল সুযোগ তৈরি করেছে, কারণ বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সক্রিয়ভাবে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের সুযোগ: 'এটিপি' খাতে মনোযোগ
একদম সরাসরি বলা যাক। বাংলাদেশ এখনই সর্বাধুনিক চিপ তৈরিতে তাইওয়ানের টিএসএমসি কিংবা স্যামসাংকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে না। একটি অত্যাধুনিক চিপ কারখানা বা 'ফ্যাব' তৈরিতে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, যার জন্য প্রয়োজন চরম বিশুদ্ধ কাঁচামাল এবং গভীর প্রকৌশল দক্ষতা; যা দশকের পর দশক ধরে শিল্প নীতির মাধ্যমে তৈরি হয়। তাইওয়ান নিজেকে ৫০ বছর ধরে অপরিহার্য হিসেবে গড়ে তুলেছে, যার কোনো সংক্ষিপ্ত পথ বা শর্টকাট নেই।

তবে ভ্যালু চেইনের প্রতিটি ধাপের জন্য অত বিশাল লক্ষ্যের প্রয়োজন নেই। নিচে এর একটি রূপরেখা দেওয়া হলো:
* লেয়ার ১: ডিজাইন — সফটওয়্যার ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা সমৃদ্ধ এই ধাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য।
* লেয়ার ২: অ্যাডভান্সড ফ্যাবস — টিএসএমসি বা স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান; যেখানে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং বহু দশকের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন।
* লেয়ার ৩: অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং এবং প্যাকেজিং (ATP) — যেখানে চিপগুলো একত্রিত, পরীক্ষা এবং ব্যবহারের উপযোগী করে প্যাকেজিং করা হয়। এখানে মূলধনের প্রয়োজন তুলনামূলক কম ($৫০-$৫০০ মিলিয়ন), এটি শ্রমঘন এবং প্রচুর শেখার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইন এই ধাপে এগিয়ে আছে।
* লেয়ার ৪: ইলেকট্রনিক্স/পিসিবি অ্যাসেম্বলি — সেমিকন্ডাক্টর ও বিভিন্ন পার্টস একত্র করে বাস্তব ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি করা; যেমন: ফোন, গৃহস্থালী সামগ্রী, কন্ট্রোল প্যানেল ইত্যাদি।
* লেয়ার ৫: কম্পাউন্ড/লেগাসি সেমিকন্ডাক্টর — পুরনো বা বিশেষায়িত চিপ (২৮ ন্যানোমিটার বা তার বেশি) তৈরি করা, যা পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স বা নবায়নযোগ্য শক্তি সিস্টেমে বিপুল ব্যবহৃত হয়। এই খাতটি দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশের বাস্তবসম্মত সুযোগ লুকিয়ে আছে লেয়ার ৩, ৪ এবং ৫-এ: প্রথমে এটিপি ও ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলিতে জোর দেওয়া, এবং পরবর্তী ১০-১৫ বছরে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ধাবিত হওয়া।

বাংলাদেশের সুবিধাসমূহ
ছয়টি মূল শক্তি বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে সমর্থন করে:
শ্রমের খরচ ও বিস্তৃতি: কারখানা শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ($৯৫-$১১০), যা ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও চীনের চেয়ে অনেকটাই কম। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি তৈরি পোশাক খাতে বিশ্বমানের তৈরি পণ্য রফতানি করে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছে। এটিপি খাতের জন্য তৈরি পোশাকের চেয়ে বেশি দক্ষতার প্রয়োজন হলেও, ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে এই ব্যবধান দূর করা সম্ভব। এছাড়া ২০৪০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে; যা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীরা ধীরে ধীরে হারাচ্ছে।

কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সুবিধাজনক। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযোগ, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে চমৎকার যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল ও অবকাঠামো: সরকারের শিল্প অঞ্চলগুলো—বেজার (BEZA) অধীনে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল, বেপজার (BEPZA) অধীনে ৮টি এবং প্রায় ৪০টি হাই-টেক বা সফটওয়্যার পার্ক—উৎসাহব্যঞ্জক প্রণোদনা এবং ৩৩,০০০ একরের তৈরি জমি সরবরাহ করছে।

বিদ্যমান ইলেকট্রনিক্স ভিত্তি: বৃহৎ পরিসরে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের সাফল্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে। ওয়ালটন নিজস্ব কারখানায় ফ্রিজ থেকে শুরু করে স্মার্টফোন—সবকিছুই তৈরি করছে। স্যামসাং এখানে ফোন অ্যাসেম্বল করছে। সরকারের ২০২৩ সালের ইলেকট্রনিক্স নীতি এখন আমদানি শুল্ক মওকুফের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা দিচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক নিরপেক্ষতা: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো কোনো সামরিক জোটে আবদ্ধ নয়। মার্কিন, চীনা, জাপানি এবং কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো নিষেধাজ্ঞা বা রফতানি নিয়ন্ত্রণের ঝামেলা ছাড়াই এখানে বিনিয়োগ করতে পারে। প্রযুক্তিগত লড়াইয়ে বিভক্ত এক বিশ্বে নিরপেক্ষতাই হলো বড় শক্তি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা: ৪০,০০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুতের সম্ভাবনা এবং নতুন নতুন উইন্ড প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনকে সবুজ জ্বালানি দিয়ে চালিত করা সম্ভব। এটি ইউরোপীয় ও আমেরিকান ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান 'ইএসজি' (পরিবেশগত, সামাজিক ও শাসনসংক্রান্ত) চাহিদা মেটাতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যের ওঠানামা থেকে সুরক্ষা পেতে সাহায্য করবে।

প্রযুক্তি হস্তান্তর: কেন ইলেকট্রনিক্স এবং কেন এখনই?
এটি কেবল পোশাকের বদলে চিপের ব্যবসা শুরু করা নয়, বরং এটি ভ্যালু চেইনের ওপরের দিকে উঠে আসার লড়াই। তৈরি পোশাক শিল্প কিন্তু বাংলাদেশে খুব বড় প্রযুক্তি হস্তান্তর ঘটাতে পারেনি; এর ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও যন্ত্রপাতি সবই বিদেশেই রয়ে গেছে। তবে ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের গল্পটি আলাদা। এখানে প্রযুক্তিগত শিক্ষা অর্জন করা কঠিন হলেও তা শিক্ষণীয় ও স্থায়ী। বাংলাদেশ যখনই এটিপি সুবিধা গড়ে তুলবে, তা তুলনামূলক জটিল কাজের ভিত্তি স্থাপন করবে। তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া যেমন কয়েক দশক আগে করেছিল, ঠিক সেভাবে একসময় বাংলাদেশও চিপ ডিজাইনের দিকে যেতে পারবে।

এই পদক্ষেপটি সঠিকভাবে গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টে এই অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে; সহজ উৎপাদন থেকে আরও জটিল উৎপাদনে যেতে না পারলে দেশকে "মধ্যম আয়ের ফাঁদে" আটকে পড়তে হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে মাথাপিছু জেনআই (GNI) প্রায় ২,৮০০ ডলার নিয়ে মধ্যম আয়ের দোড়গোড়ায় রয়েছে। বার্তাটি পরিষ্কার: পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা বজায় রেখে স্থবির হয়ে থাকা, নাকি নতুন অধ্যায় খুলে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথ তৈরি করা।

কী পরিবর্তন দরকার: নীতির ফাঁকফোকর
ভৌত অবকাঠামো অনেকটাই প্রস্তুত। কিন্তু ঘাটতি কোথায়? নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে।

এফডিআই (FDI) প্রণোদনা: বর্তমান ইলেকট্রনিক্স নীতি কিছু কর সুবিধা প্রদান করে, তবে বাংলাদেশের উচিত আরও বড় পদক্ষেপে যাওয়া: বৃহৎ এটিপি বিনিয়োগের জন্য ১০ বছরের কর মওকুফ (Tax Holiday) ঘোষণা করা; যেমনটা মালয়েশিয়ার পেনাং অঞ্চল ইন্টেল বা এএমডিকে আকৃষ্ট করতে করেছিল। সাথে দ্রুত লাইসেন্সিং নিশ্চিত করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পুরোপুরি দূর করা, যা 'বাংলাবিজ' প্রতিশ্রুতি দেয় তবে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

কারিগরি শিক্ষা: পলিটেকনিক ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মাইক্রোইলেকট্রনিক্সের দিকে চালিত করা। বুয়েট, কুয়েট এবং রুয়েটের সাথে শিল্পের অংশীদারিত্ব, কারিকুলাম সংস্কার এবং ল্যাবরেটরির জন্য অর্থায়ন প্রয়োজন। এআইইউবি এবং ইউআইইউ-এর মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্প্রতি এআই ল্যাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই পথে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের নতুন এআই এবং স্টার্টআপ ফান্ডকে মডেল ধরে পরবর্তীতে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর ওয়ার্কফোর্স ফান্ড' গঠন করা দরকার।

প্রধান বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান (Anchor Tenants): এটিপি খাতের জন্য ইন্টেল, আমকোর (Amkor) বা এএসই (ASE)-এর মতো বৈশ্বিক জায়ান্টদের অন্তত এক বা দুটিকে দেশে নিয়ে আসা। তাদের আগমন পুরো ইকোসিস্টেম তৈরি করবে—সরবরাহকারী, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং প্রযুক্তির প্রসার ঘটবে। ঠিক এভাবেই মালয়েশিয়া (পেনাং), আয়ারল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হাব হয়ে উঠেছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান: তাইওয়ানের ‘আইটিআরআই’-এর আদলে একটি 'ন্যাশনাল মাইক্রোইলেকট্রনিক্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করা, যা শুরুতে কম বাজেটে হলেও শুরু করা উচিত। এটি বিশ্ববিদ্যালয় যা শেখায় এবং শিল্পের যা প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যকার দূরত্ব কমাবে।

সুযোগটি নেওয়ার উপযুক্ত সময়
যেকোনো সুযোগের জন্য সময়টাই আসল। ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং তরুণ জনশক্তির উপস্থিতির যে বিরল সংযোগ এখন ঘটেছে—তা সচরাচর ঘটে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প শৃঙ্খলা, অবকাঠামো এবং সুনাম তৈরি করেছে, কিন্তু ক্রমবর্ধমান অটোমেশন এবং ট্রেড প্রিভিলেজ কমার মুখে এই খাত একা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে না।

ইলেকট্রনিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টর খাত গার্মেন্টস শিল্পকে এক দিনে প্রতিস্থাপন করবে না, তবে এটি অর্থনীতির পরবর্তী গল্প, পরবর্তী ধাপ। এটি আরও স্থিতিস্থাপক, প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক এবং ভবিষ্যৎমুখী এক অধ্যায় যা তৈরি পোশাক খাতের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি হবে।

সুযোগের দরজাটি এখন খোলাই আছে। বাংলাদেশ এই সুযোগটি কাজে লাগাবে কি না—তা এখন পুরোপুরি বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.