একসময় স্থানীয় বাজারে তেমন কদর ছিল না। উৎপাদিত জাম্বুরা বিক্রি করতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তেন কৃষকেরা। সময়ের পরিবর্তনে সেই অবহেলিত ফলই এখন হয়ে উঠেছে জুড়ী উপজেলার সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। স্বাদ, আকার ও গুণগত মানের কারণে মৌলভীবাজারের জুড়ীর বাতাবিলেবু বা জাম্বুরার চাহিদা বাড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সিলেটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে এ ফল। এতে কৃষকের মুখে ফুটেছে তৃপ্তির হাসি, এসেছে অনেক পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা। সম্ভাবনাময় এই ফল বিদেশে রপ্তানির স্বপ্নও দেখছেন কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার টিলাবেষ্টিত বিভিন্ন গ্রাম ও বসতবাড়ির আশপাশে ব্যাপকভাবে জন্মে জাম্বুরা। অনেকে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি এ ফলের চাষ করে বাড়তি আয় করছেন। আবার কারও কারও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে জাম্বুরা চাষ। স্থানীয়ভাবে ‘মাতু জামির’ নামেও পরিচিত এ ফলের স্বাদে রয়েছে টক, মিষ্টি ও হালকা তিতার মিশ্রণ। স্বতন্ত্র স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জুড়ীর জাম্বুরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জুড়ী উপজেলার হায়াছড়া, শুকনাছড়া, জামকান্দি, দুর্গাপুর, গোবিন্দপুর, বিনোদপুর, লালছড়া, রূপাছড়া, লাঠিটিলা, ডোমাবাড়ী, কুচাইরতল, কচুরগুল ও পুটিছড়াসহ বিভিন্ন গ্রামের টিলাবাড়ি এবং বসতবাড়ির আশপাশে জাম্বুরার আবাদ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬৬ হেক্টর জমিতে ১০ হাজারের মতো জাম্বুরাগাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে ফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২০০ মেট্রিক টন।
কৃষকদের ভাষ্য, একটি প্রাপ্তবয়স্ক গাছে সাধারণত ১০০ থেকে ৫০০টি জাম্বুরা ধরে। তবে কোনো কোনো গাছে ফলের সংখ্যা এক হাজার পর্যন্ত হতে পারে। সঠিক পরিচর্যা ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ ফলের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
জাম্বুরা ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ একটি পুষ্টিকর ফল। গ্রামীণ জনপদের টিলাময় পরিবেশে এ ফলের গাছ ভালো জন্মে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ ও পতিত জমিতেও জাম্বুরার চাষ হচ্ছে। তুলনামূলক কম খরচে চাষাবাদ এবং বাজারে বাড়তি চাহিদা থাকায় কৃষকদের কাছে এটি অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় একটি ফল।
সাধারণত আশ্বিন থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত জাম্বুরা গাছে ফল থাকে। তবে কৃষকদের মতে, আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফল বেশি পরিপক্ব হয়। এ সময় বাজারে সরবরাহও বাড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলা সড়কের কালামাটি নামক ত্রিমুখী পয়েন্টে ব্যস্ত সময় পার করছেন জাম্বুরার ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট পিকআপভ্যানে করে জাম্বুরা এনে সেখানে জড়ো করা হচ্ছে। পরে আকার অনুযায়ী বাছাই করে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে এসব ফল। এরপর বড় ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন ফলের বাজারে।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর জুড়ী থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ট্রাক জাম্বুরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। একসময় স্থানীয় বাজারে এ ফলের চাহিদা সীমিত থাকলেও এখন শহরের বাজারগুলোতে এর ভালো চাহিদা রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী কালা মিয়া ও হেলাল উদ্দিন আরও কয়েকজন জানান, তাঁরা প্রতিবছর অগ্রিম চুক্তিতে একাধিক জাম্বুরাবাগান কিনে নেন। মৌসুমে শ্রমিক দিয়ে গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে সড়কের পাশে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে আসেন। এরপর আকার অনুযায়ী বাছাই করে বস্তাবন্দী করা হয়। পরে বড় ট্রাকে করে এসব জাম্বুরা ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাঁচাবাজারে পাঠানো হয়। সেখানে আড়তদারেরা বস্তা হিসেবে পাইকারি বিক্রি করেন। প্রতি বস্তা জাম্বুরা আকার ও মানভেদে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয় বলে জানান তাঁরা।
জুড়ীর জাম্বুরার চাহিদা বাড়ার পেছনে এর স্বাদ ও গুণগত মান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ফল ব্যবসায়ী মারুফ আহমদ বলেন, জুড়ী উপজেলার জাম্বুরার চাহিদা তাঁদের বাজারে অনেক বেশি। ক্রেতারা এ ফল পছন্দ করেন বলে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। স্বাদ ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অনলাইন ফল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়াম ফ্রুটসের স্বত্বাধিকারী আবু সাঈদ আল সাগর জানান, গত দুই বছর ধরে তাঁরা জুড়ী থেকে জাম্বুরা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছেন। এ ফলের চাহিদা বাড়ায় তাঁরা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে জুড়ীর জাম্বুরা বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।
তাঁর মতে, জুড়ীর জাম্বুরার স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণগত বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এ ফল দেশের কৃষি অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
জুড়ীর জাম্বুরার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি বিভাগও উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে পরিক্ষা নিরিক্ষার মাধ্যমে ‘জুড়ী বাতাবিলেবু -১’ ও ‘জুড়ী বাতাবিলেবু -২’ নামে দুটি জাত উদ্ভাবন করা হয়। এ জাতগুলোর ফল আকারে বড় এবং খেতে সুস্বাদু। এর মধ্যে একটির শাঁস গাঢ় লাল, অন্যটির শাঁস আংশিক সাদা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, শুকনাছড়া গ্রামের প্রবীণ কমলাচাষি প্রয়াত ইব্রাহিম আলীর বাড়িতে এসব জাতের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ছাড়া জুড়ীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে আরও ১৬টি সম্ভাবনাময় জাতের সন্ধান পেয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে বাতাবিলেবু-১, বাতাবিলেবু-২ ও বারি বাতাবিলেবু-৫-এর চারা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাগানের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শুকনাছড়া, লালছড়া ও জড়িছড়া এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, একসময় জাম্বুরার বাজার সীমিত থাকায় উৎপাদিত ফল বিক্রি করা নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। মূলত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন বাজারেই এসব ফল বিক্রি করা হতো। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি জাম্বুরা পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে ফলটির বাজারমূল্য ও চাহিদা বেড়েছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সমস্যাও রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, গান্ধিপোকা সহ বিভিন্ন রোগবালাই এবং কাঠবিড়ালির উপদ্রবে তাঁদের অনেক ফল নষ্ট হচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা।
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, “জুড়ীতে জাম্বুরা প্রাকৃতিকভাবেই ভালো জন্মে। এখানকার জাম্বুরার জাতগুলো অত্যন্ত ভালো। সারাদেশে বাতাবিলেবুর চাহিদা থাকলেও বাজারে সব সময় মানসম্মত জাতের ফল পাওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, বাতাবিলেবুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ কারণে জুড়ী কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে উন্নত জাতের চারা বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সম্ভাবনাময় আরও ১৬টি জাতের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন এবং নতুন বাগান গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাগানের পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “জুড়ীর এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে। আমি প্রত্যেক কৃষককে উদাত্ত আহ্বান জানাই, জাম্বুরা চাষের এই ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত থাকে।”
একসময় যে ফল বিক্রি করা নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তা ছিল, সেই জাম্বুরাই এখন তাঁদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন সম্ভাবনার। জুড়ীর এই ফলকে কেন্দ্র করে কৃষি ও ব্যবসা দুই ক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে নতুন সুযোগ। উন্নত জাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ ফলের উৎপাদন ও বিপণন বাড়ানো সম্ভব।
পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ, সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ, উপযুক্ত প্যাকেজিং এবং রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও জুড়ীর জাম্বুরার প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জুড়ীর জাম্বুরা এখন আর শুধু স্থানীয় জনপদের একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি হয়ে উঠছে কৃষকদের বাড়তি আয়ের উৎস এবং এলাকার সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। সঠিক পরিকল্পনা ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে জুড়ীর জাম্বুরা একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারেও পরিচিতি পেতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
