বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ ও দ্রুত করতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনটি বিশেষায়িত কান্ট্রি ডেস্ক চালু করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।
গতকাল শনিবার ঢাকায় আয়োজিত ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানে এসব ডেস্কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে শতাধিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বেপজা জানায়, বর্তমানে সংস্থাটির অধীন আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান শীর্ষ তিন বিনিয়োগকারী দেশ। এসব দেশের বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে নতুন ডেস্কগুলো কাজ করবে। অনুষ্ঠানে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও দৃঢ় করা, তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশা সরাসরি জানা এবং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও ব্যবসাবান্ধব করাই এ ধরনের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বেপজা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সংস্থাটি। একই সময়ে বেপজাধীন জোনগুলো থেকে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আরও বলেন, চলতি বছরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২, যশোর ইপিজেড ও পটুয়াখালী ইপিজেডকে পূর্ণাঙ্গ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব নতুন জোনে বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, বেপজা ‘থ্রি-আর’ নীতির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সার্কুলার ইন্ডাস্ট্রিয়াল কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের সেবা উন্নত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ইনভেস্টরস ক্লাব, ফায়ার স্টেশন, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কান্ট্রি ডেস্ক চালুর বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এসব ডেস্ক চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করবে। পাশাপাশি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণেও ভূমিকা রাখবে। অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির বিভিন্ন অর্জন ও অগ্রগতি তুলে ধরেন। তার উপস্থাপনায় বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিক কল্যাণ, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজীকরণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ উঠে আসে। এছাড়া বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এবং যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন ইপিজেড স্থাপনের অগ্রগতি তুলে ধরে এসব জোনে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। চালু জোনগুলোতে জমির সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তানভীর হোসেন বলেন, সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেই বেপজা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বেপজার অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (এন্টারপ্রাইজ সার্ভিসেস ও শিল্প সম্পর্ক) নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া তার উপস্থাপনায় ইপিজেডের শ্রমিক কল্যাণ, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, ইপিজেড শ্রম আইন সংশোধন এবং ভবিষ্যতের শ্রমসম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন। পরে বেপজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উন্মুক্ত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বিদ্যমান শিল্প পরিচালনার সমস্যা সমাধান, বেপজার বিভিন্ন সেবা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও উন্নত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯’ নিয়েও মতবিনিময় করেন অংশগ্রহণকারীরা। এ সময় আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রেখে বিনিয়োগকারী ও শ্রমিক উভয় পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বেপজা। অনুষ্ঠানে কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কেবিসিসিআই) সাধারণ সম্পাদক মিলিয়ন পার্ক বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। বাংলাদেশে, বিশেষ করে বেপজাধীন জোনগুলোতে কোরীয় বিনিয়োগ বাড়াতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নীতিগত প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এপিক গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট পিন্টু কুমার শ বেপজার ব্যবসাবান্ধব সেবার প্রশংসা করেন এবং যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন ইপিজেডে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে তাদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংস্থাটির দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই), কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কেবিসিসিআই) এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) প্রতিনিধিসহ বেপজাধীন ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের শতাধিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী অংশ নেন।
১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেপজা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে সংস্থাটির অধীন আটটি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব জোনে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ক্রমপুঞ্জীভূত রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের মোট রপ্তানিতে বেপজাধীন জোনগুলোর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
