তিনজন পুলিশ সদস্য, সাথে আছে হাত কড়া পড়ানো আসামী; পায়ে তার লোহার ডান্ডাবেড়ি। হাতের মুভমেন্টের জন্য আসামীর একটি হাত হ্যান্ডকাপ মুক্ত থাকলেও, দুই পা বদ্ধ ছিল ডান্ডাবেরিতে। আট/নয় রাস্তার সমারোহের একপাশে দাড়িয়ে অপেক্ষারত ছিলেন গাড়ির জন্য। মিনিট দশেক পর এলো চাঁপাইনবাজগঞ্জ জেলামূখী একটি বিআরটিসি বাস। অন্যান্য যাত্রীদের মতো আসামী সমেত উঠে পড়লো পুলিশ সদস্যরা। পায়ে ডান্ডাবেরি থাকার কারণে আসামীকে বেশখানিকটা ভোগান্তি পোহাতে হলো বাসে উঠতে। ডান্ডাবেরির ঘর্ষণে অপরাধীর পায়ের গোড়ালির উপরাংশে ছিলে গেছে বেশখানিকটা। কখনো দেখা যাচ্ছে রক্ত, আবার কখনোবা একটু নড়ানড়িতে আসামী করছেন ইস-আস। রোদের প্রখর তাপে পিচ ঢালা উত্তপ্ত রাস্তার গরমও সহ্য করতে হচ্ছে স্যান্ডেলবিহীন দাড়িয়ে থাকার কারনে।
আসামীর প্রতি অবহেলা আর কিছুটা অমানবিক সেই দৃশ্যপটের স্বাক্ষী হয়ে রইলো প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখ। ঘটনাটি ঘটেছে ১৯ সেপ্টেম্বর বেলা আনুমানিক ১:৪০ থেকে ২টার মধ্যে রাজশাহী নগরীর গোরহাঙ্গা রেলগেটস্থ এলাকায়।
-6aafe8bdf01e2.jpg)
আসামীর পায়ের পড়ানো ডান্ডাবেরিটি গোলাকার হলে এমনটা হতোনা। ডান্ডাবেরির গঠণটি কিছুটা চ্যাপ্পা ও অমসৃণ থাকার কারনেই মুভমেন্টের সময় সেটার ঘর্ষণে ছিলা ফোলাসহ রক্তপাতের মতো ঘটনা ঘটেছে। দুটো পা দিয়ে মাঝেমধ্যেই রক্তের ছোট ছোট ফোঁটা পরতেও দেখাগেছে। আসামী নিজের পা দুটো সামান্য একটু নড়াতেই অনুভব করছিল ব্যথা; এক পা দিয়ে অন্যপায়ের ডান্ডাবেরির সেই লোহার চাকতি দুটো মাঝেমধ্যেই যৎসামান্য সরানোর চেষ্টা করছেন তিনি। সেই চেষ্টা সেটি খুলে ফেলার জন্য নয়, কেটে যাওয়া স্থান থেকে ডান্ডাবেরির একাংশ সরানোর জন্য।
পুলিশ হেফাজতে থাকা সেই যুবক দুর্ধর্ষ আসামি হলেও সাধারণ অর্থে সে তো মানুষ। তাই হয়তো, আশেপাশের পথচারি আর অপেক্ষারত যাত্রীদের মানবিক চোখ এড়াতে পারেনি আসামীর ধীর গতির সেই রক্তপাত আর লোহার বেরিতে কেঁটে/ছিলে যাওয়া স্থানটি। অনেকেই অবাক চোখে দেখতে লাগলো রাস্তার পাশে গাড়ির জন্য অপেক্ষারত পুলিশ সদস্যদের হেফাজতে থাকা সেই আসামীর কষ্টের বিষয়টি। পেছনে দাড়িয়ে থাকা বেশকয়েকজন মহিলা ও পুরুষ যাত্রী বিড় বিড় করে বলেই ফেলেলো; ইসরে, ছেলেটার কত কষ্ট হচ্ছে; কেটে যাওয়া স্থানে একটু স্যাভলন বা মলম লাগিয়ে দিলেই তো ছেলেটার কষ্টটা একটু কমে। তার উপর এই গরমে পায়ে নেই কোন স্যান্ডেল। আরেকজন তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো, দুই-চারটা হ্যান্ডিক্যাপ লাগিয়ে দিলেই তো আসামীটার কষ্ট কিছুটা লাঘোব হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মানবিকতা আজ যেনো প্রায় ধ্বংসের পথে। আসামী হলেও তারও রয়েছে মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। যথা সময়ে যথাযথ চিকিৎসা ও ডাক্তারি সেবা পাবার অধিকার সবারই আছে। হোক সে আসামী কিংবা সাধু-সন্ন্যাসী।
এমন অনেক মন্তব্যের মধ্যেই, পুলিশ সদস্যরা যথানিয়মে আসামীকে নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উঠে পড়লো বাসে। পুলিশ সদস্যদের পাশে দাড়িয়ে থাকা একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আসামীকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে তারা অপেক্ষা করছিলেন। বাসের জন্য অপেক্ষারত আসামী সমেত পুলিশের এই উপস্থিতি সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও পীড়া দিয়েছে।
ডান্ডাবেড়ির মূল আইনি অবস্থান: বাংলাদেশ জেল কোডের (প্রিজন এ্যাক্ট) ১৯ নম্বর অধ্যায়ের ৭০৮ নং প্রবিধান অনুযায়ী, কারাগারের ভেতরে গুরুতর ‘কারা অপরাধের’ শাস্তি হিসেবে কেবল সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য ডান্ডাবেড়ি পরানোর বিধান রয়েছে। সাধারণ বিচারাধীন আসামি কিংবা আদালত কক্ষে হাজির করার সময় কোনো বন্দিকে ডান্ডাবেড়ি পরানো উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুরোপুরি বেআইনি ও অমানবিক।
মানবাধিকার ও সংবিধানের লঙ্ঘন: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া বা তার সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। লোহার ডান্ডাবেড়ি পরানোকে মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা মধ্যযুগীয় বর্বরতা এবং সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করেন।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা: আসামিকে যত্রতত্র বা অযৌক্তিকভাবে ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরানোর অপব্যবহার রোধে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা রিট করেছেন এবং মহামান্য হাইকোর্টও এ বিষয়ে রুল জারি করেছেন।
সূত্র বলছে, আসামিকে স্থানান্তরের সময় হ্যান্ডকাফ (হাতকড়া) বা ডান্ডাবেড়ির (পায়ের বেড়ি) কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া বা রক্তপাত হলে, এর প্রাথমিক আইনি ও প্রশাসনিক দায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এস্কর্ট বা পাহারারত পুলিশ/কারা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। বাংলাদেশের আইন (পিআরবি, জেল কোড) এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এই দায় নির্ধারণের মূল বিষয়গুলো হলো;
গ্রেপ্তারকৃত বা বিচারাধীন যেকোনো ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকার সময় তার শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি বেড়িটি ত্রুটিপূর্ণ থাকে কিংবা অতিরিক্ত টাইট করে পরানো হয়, এবং এর ফলে আসামির শরীর কেটে রক্তপাত হয়, তবে তা দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে গণ্য হবে। পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি ৩৩০) এবং জেল কোড অনুযায়ী, আসামির শারীরিক ক্ষতি না করে কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হাতকড়া বা বেড়ি ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আদালতের নির্দেশনা অবমাননা: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না বা তার সাথে এরূপ আচরণ করা যাবে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একাধিক নির্দেশনা রয়েছে যে, ডান্ডাবেড়ি বা হ্যান্ডকাফ কোনো সাধারণ নিয়ম নয় এবং এটি পরানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অকারণে বা ত্রুটিপূর্ণ বেড়ি পরিয়ে রক্তপাত ঘটানো হলে তা মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং আদালতের নির্দেশনার সুস্পষ্ট অবমাননা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
