× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

ক্ষমতার পালাবদলেও থামছেনা লাউয়াছড়ায় গাছ পাচার, ধরাছোঁয়ার বাহিরে সংঘবদ্ধ চোরচক্রের হোতারা

মো: আব্দুল কাইয়ুম, মৌলভীবাজার

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:১৫ পিএম

২৪ এর ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ আমলে লাউয়াছড়া বন কার্যত বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ এর সাবেক কৃষি মন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ ও তাঁর ভাইদের একচ্ছত্র আধিপাত্য ছিলো। এমন কী ওই সময়টাতে দিনেদুপুরে বনের গহীনে উঠতি বয়সীদের মোটর সাইকেল দিয়ে মহড়া দেয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে। তবে তাদের ক্ষমতার দাপটে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। ওই সময়ে বনের গাছ চুরির ঘটনার সাথে তাদের মদদপুষ্ট চোরচক্রের সম্পৃক্ততার গুঞ্জনও বেশ পুরোনো। 

বনের বিশাল বিশাল গাছ চুরির ঘটনাও ঘটেছে বহুবার। তবে ওই সময়ে চোর চক্রের মূলোৎপাটন কিংবা তাদের বিরুদ্ধে দায়সারা অবস্থান নিতে দেখা গেছে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের। সেসময় চোর চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় নিয়ে না আসার ফলশ্রুতিতে বাড়তে থাকে একের পর এক সেগুন সহ মহামুল্যবান গাছ চুরির ঘটনা। অবশ্য লাউয়াছড়া বনে গাছ পাচার নতুন কিছু নয়,এটি অনেক পুরোনো। ২৪ এর ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর আপাদত দৃষ্টিতে দৃশপট বদল কিংবা ক্ষমতার পালাবদল হলেও ঘুরে ফিরে এখনো লাউয়াছড়া বন ঘিরে সক্রিয় ক্ষমতাধর চোরচক্র। 

বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত দেড় বছরে লাউয়াছড়া বনের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিশাল ্িবশাল বেশ কয়েকটি গাছ চুরির ঘটনায় চোরচক্রের বিরুদ্ধে অন্তত ৭টি মামলা দায়ের করেছে বন বিভাগ। এসব মামলায় অস্তত ২১জনকে আসামী করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ওই সূত্র। বন বিভাগ সূত্র চোরচক্রের নাম প্রকাশ করতে না চাইলেও সর্বশেষ দায়ের করা মামলার আসামীদের মধ্যেও এমন আসামী রয়েছেন যে পূর্বের দায়ের করা মামলায়ও আসামী হিসেবে নাম রয়েছে এমন ব্যক্তিও রয়েছে।   

সর্বশেষ চলতি মাসের ৭ সেপ্টেম্বর ভোরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জানকিছড়া নামক এলাকা থেকে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশ থেকে বিশাল একটি সেগুন গাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৭ ফুট বেড়ের এই গাছটির আনুমানিক বাজারমূল্য লক্ষ টাকার কাছাকাছি হবে বলে ধারনা করা যাচ্ছে। ব্যস্ত সড়কের পাশে বন বিভাগ ও পুলিশের অব্যাহত টহলের মাঝে কীভাবে চোরচক্র বিশালাকৃতির গাছটি কেটে নিরাপদে চম্পট দিলো তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা গুঞ্জন। এ ঘটনায় লাউয়াছড়ার বিট কর্মকর্তা বাদী হয়ে কমলগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হলে তদন্তে নামে পুলিশ। আশপাশের বাজারের সিসিটিবি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা শেষে ফুটেজ দেখে আনসার আলী নামে চোর চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে মূল হোতারা। বন বিভাগের দ্বায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, সেসময় প্রচুর পরিমাণে টানা বৃষিপাত হওয়ায় তারা ঘরে ফিরে যাওয়ায় চোরচক্র সুযোগটিকে কাজে লাগায়।

এদিকে একের পর এক গাছ চুরির ঘটনার পাশাপাশি লাউয়াছড়া বনে বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলও এখন দিনদিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রায় প্রতিদিনই বনের আশপাশের কোথাও না কোথাও লোকালয়ে ধরা পড়ছে বিষধর কিং কোবরা. বিশাল বিশাল অজগর সহ নানা বন্য প্রাণী। সড়কে গতি না মানা, যানবাহনের উচ্চ শব্দ,জনবসতি, একের পর এক রিসোর্ট তৈরি,বনে দর্শনার্থীর চেঁচামেচি আর ভিতর দিয়ে বয়ে চলা ট্রেনের বিকট শব্দ বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। নিরাপদ বন,বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি রক্ষা সহ এসব সমস্যা সমাধানে কার্যত সংশ্লিষ্টদের তেমন কোন মাথ্যাব্যথা নেই বললেই চলে।    

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ চুরির ঘটনার রাতে জানকিছড়া গেটে দায়িত্বে ছিলেন বহ প্রহরী বাবুল ও সিপিজি সদস্য বিজয় বাউরি । অন্যদিকে, লাউয়াছড়া প্রধান ফটকে বিট কর্মকর্তা নিজে টহল পুলিশের একটি দল নিয়ে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সশরীরে  উপস্থিত ছিলেন। এত কড়া নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কীভাবে সড়কের পাশ থেকে বিশাল গাছটি কেটে নিয়ে গেল চোরচক্র, এ নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন জেগেছে। 

জানকিছড়া ক্যাম্প এর বন প্রহরী বাবুল হোসেন বলেন,ওই সময়ে প্রচুর বৃষ্টি শুরু হলে আমি ক্যাম্পে চলে যাই। বৃষ্টি চলে টানা ভোর ৬টা পর্যন্ত। এর মধ্যে অল্প সময়ের ব্যবধানে সেগুন গাছ চুরির ঘটনা ঘটে। আমরা শুনার পর ঘটনাস্থলে যাই এবং ফেলে রাখা গাছের বাকি অংশটুকু ক্যাম্পে নিয়ে আসি। তিনি বলেন, ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এতো বড় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৩ জন স্টাফ আর ১জন বিট অফিসার। একদিকে গেলে আরেক দিকে অন্ধকার। তারপরও চেষ্টা করি সরকারি সম্পদ রক্ষার জন্য। তার মধ্যেও অপ্রীতিকর কিছু ঘটনা ঘটে। আমরা এ ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং মাল উদ্ধরে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কারা জড়িত তা এই মুহুর্তে গোপন রাখা উপর মহলের নির্দেশ রয়েছে। 

জানকিছড়া ক্যাম্পের সিপিজে সদস শুক্কুর আলী টনাই বলেন, টহল চলা অবস্থায় বৃষ্টি চলাকালে সর্বোচ্চ আধাঘন্টার মধ্যে গাছটি কেটে গাড়িতে উঠিয়েছে। তখন ফুলবাড়ির একজন সিপিজি ছিলো আর এখানে একজন ছিলো। এছাড়াও লাউয়াছড়ার বিট অফিসার ও স্টাফরা ছিলো। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে গাছটি নিয়ে গেছে চোর চক্র। সম্ভবত অনেকদিন যাবত গাছটি টার্গেটে ছিলো। ২ থেকে ৩ মাস আগেও গাছটি কমলগঞ্জের একটি চোর চক্র কেটে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তখন একসাপ্তাহ যাবত পুরো রাত জেগে আমরা পাহাড়া দিয়েছি।   

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বিট কর্মকর্তা মারজুক হোসেন বলেন, রাতে আমি সহ আমার স্টাফরা ছিলো টহলে। তারপর শেষ রাতে বৃষ্টি শুরু হলে বাসায় চলে আসি। চোর চক্র বিভিন্ন বাজারের সিসি ক্যামেরা ফুটেজের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছে। আমরা কমলগঞ্জ থানা পুলিশের সহায়তাও চেয়েছি। যেন আমরা প্রকৃত চোরচক্র সনাক্ত করতে পারি এবং যেটা চুরি হয়েছে সেটা যেন আমরা হেফাজতে নিয়ে আসতে পারি।  যে অঘটনটা ঘটছে সেটার সাথে যদি আমাদের বন বিভাগের কেউ কিংবা এলাকার কেউ বা রাজনীতি ব্যক্তিবর্গ সহ যদি কারো সম্পৃক্তা থাকে। তাহলে আমরা তদন্তের মাধ্যমে যার নামই আসবে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করব।    

শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, চুরি হয়ে যাওয়া মূল্যবান সেগুন কাঠ উদ্ধার এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে আমাদের বিট কর্মকর্তার নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ওদিকে সরকার ঘোষিত দেশের ১০টি জাতীয় উদ্যানের অন্যতম কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া বনে গাছ চুরি অভিযোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর জুড়ে এক শ্রেণির সংঘবদ্ধ চোরচক্র বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান বনজ সম্পদ লুট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিশালাকৃতির সেগুন সহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। শুধু গাছ চুরি নয়, বনাঞ্চলের জমি দখল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে বনভূমির বিশাল অংশ দখল হয়ে সেখানে রিসোর্ট, বিভিন্ন ধরনের বাগান ও স্থাপনা গড়ে ওঠায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে দাবি সচেতন মহলের।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর জাতীয় পরিষদ সদস্য আ.স.ম সালেহ সুহেল বলেন, বনের গাছ চুরির সাথে সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র জরিত। এভাবে গাছ চুরি অব্যাহত থাকলে বিপন্ন হবে বনের প্রাণ-প্রকৃতি, সংকটে পড়বে বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। তিনি বলেন, বনে গাছ চুরির পাশাপাশি জনবসতি ও বনের আশপাশে রিসোর্ট গড়ে উঠায় বন্যপ্রাণীর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে লাউয়াছড়া। যার কারণে খাদ্য সংকট সহ নানা সংকটের কারণে দিনদিন লোকালয়ে ধরা পড়ছে বন্যপ্রাণী। 

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.