চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দলটির দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় গুলির শব্দ শোনারও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে মুরশেদুল আলম সোহাগ নামে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক যুগ্ম আহ্বায়ক রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সীতাকুণ্ড পৌর সদরে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের অনুসারীদের একটি অংশ বাঁশবাড়িয়া এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। দুপুর ২টা থেকে প্রায় সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টার অবরোধে মহাসড়কের উভয় লেনে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা।
যেভাবে সংঘর্ষ-
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আসলাম চৌধুরীর অনুসারী ও উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোহাম্মদ মুরসালিনের নেতৃত্বে একটি মিছিল পৌর সদর প্রদক্ষিণ করে এগিয়ে যাওয়ার সময় কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের অনুসারীদের একটি দলের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হলে পৌর সদরের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পথচারী ও সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। একই সঙ্গে গুলির শব্দও শোনা গেছে বলে স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেন। তবে এসব ঘটনায় কারা জড়িত এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আহতের প্রকৃত সংখ্যাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
মহাসড়কে অবরোধ
সংঘর্ষের একপর্যায়ে কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের অনুসারীদের একটি অংশ বাঁশবাড়িয়া এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেন। দুপুর ২টার দিকে শুরু হওয়া অবরোধ চলে প্রায় সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। এ সময় মহাসড়কের উভয় লেনে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের অনুসারী ও কুমিরা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. শামসুদ্দৌহা বলেন, তাঁদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে দুপুর ২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করা হয়।
বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিল্টন মন্ডল বলেন, বাঁশবাড়িয়া এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরা দুপুর ২টার দিকে মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় লেনে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পুলিশের বক্তব্য-
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহিনুল ইসলাম বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুই পক্ষ পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করে। দুপুরে মুন স্টার কমিউনিটি সেন্টার থেকে একটি পক্ষ মিছিল নিয়ে পৌর সদরের দিকে আসার সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর মহাসড়ক থেকেও অবরোধকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ঘটনার পর পৌর সদর, হাসান গোমস্তা মসজিদ এলাকা, মুন স্টার কমিউনিটি সেন্টার এবং মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়।
বিকেলে আসলাম চৌধুরীর সমাবেশ
দুপুরের সংঘর্ষ ও মহাসড়ক অবরোধের পর বিকেল ৫টার দিকে সীতাকুণ্ডে আসেন বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরী এফসিএ। পরে তিনি সীতাকুণ্ড পৌর সদরের এল কে সিদ্দিকী স্কয়ারে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত র্যালি ও জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর। সঞ্চালনা করেন উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোহাম্মদ মোরসালিন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জহুর, যুগ্ম আহ্বায়ক সালামত উল্ল্যাহ, যুগ্ম সদস্যসচিব ফজলুল করিম চৌধুরী, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন, সদস্যসচিব ছালেহ আহমদ সলুসহ উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতৃবৃন্দ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
‘বিএনপি বাংলাদেশি ভাবধারার ধারক-বাহক’
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জনসভায় আসলাম চৌধুরী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মাতৃভূমির স্বকীয়তা, আত্মপরিচয় ও মাথা উঁচু করে গৌরবময় অভিযাত্রার লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি দেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা ও সমৃদ্ধির পাশাপাশি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা রেখে আসছে।
তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন লড়াই-সংগ্রাম করে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের একটি অনন্য অবস্থান তৈরি করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
আসলাম চৌধুরী আরও বলেন, শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার সন্তান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত করেছেন। তাঁর মেধা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ মানবিক ও পরিবর্তিত রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দলের মধ্যে কোনো বিভাজন তৈরি করা যাবে না। সীতাকুণ্ড তথা চট্টগ্রাম-৪ আসনকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে সারাদেশে তুলে ধরার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
‘গ্রুপের রাজনীতি চলবে না’
দুপুরের সংঘর্ষের প্রসঙ্গ টেনে আসলাম চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কিছু বিশৃঙ্খলা হয়েছে এবং কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তবে সীতাকুণ্ড বিএনপিতে কোনো ধরনের ‘গ্রুপের রাজনীতি’ চলবে না।
সংঘর্ষ ও কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও পৌর বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশ শেষে আসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি এল কে সিদ্দিকী স্কয়ার থেকে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উত্তর বাজার এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। এর মধ্য দিয়ে দিনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শেষ হয়।
রাজনৈতিক বিরোধে নতুন উত্তেজনা
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো দলীয় কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একই দলের দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান, সংঘর্ষ ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় সীতাকুণ্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। পৃথক কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান থাকলেও মঙ্গলবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই উত্তেজনা আরও প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে।
পৌর সদরের জনবহুল এলাকায় সংঘর্ষ এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেড় ঘণ্টা অবরোধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মহাসড়ক অবরোধের কারণে দূরপাল্লার যাত্রী, পণ্যবাহী যানবাহনের চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার থাকলেও দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল ও জননিরাপত্তার ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
এদিকে সংঘর্ষের সময় ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনার যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং পৌর সদর ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
