গাজীপুরসহ সারা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা এবং চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক অপরাধ।
গাজীপুর মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপরাধের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত প্রধান পাঁচটি এলাকার মধ্যে রয়েছে চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গী, সদর থানা এলাকা, কোনাবাড়ী এবং জয়দেবপুর বা সংলগ্ন শিল্পাঞ্চল।
সাম্প্রতিক পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে অপরাধের গ্রাফ দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পনগরী গাজীপুর এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
‘হটস্পট’ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (GMP) এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহানগরের মূলত পাঁচটি প্রধান পয়েন্টে অপরাধের রাজত্ব সবচেয়ে বেশি
টঙ্গী স্টেশন রোড ও উড়ালসড়কে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের মূল আস্তানা। চান্দনা চৌরাস্তা ও জয়দেবপুরে মাদক ব্যবসা এবং পকেটমার-ছিনতাইকারীদের নিরাপদ রুট। কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরে তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি এবং ডাকাতি।
সম্প্রতি গাজীপুরে প্রবাসীর বাড়ীতে ডাকাতি ও ডাকাত বেশে ঢুকে গৃহবধূকে হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। এছাড়া গত জুলাই ও আগস্ট মাসেও কালিয়াকৈর, কাপাসিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এবং পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) দেশে ১,১৪২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনে গত এপ্রিল ২০২৬ মাসে এক লাফে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ২০ শতকের চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ২,MD_NUM১টি-তে পৌঁছায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, বছরের প্রথম ৭ মাসেই প্রায় ১,৬৬৭ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
ছিনতাই ও মব জাস্টিসে রাজধানী ঢাকা (বিশেষ করে মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকা) এবং দেশের বড় বড় মহাসড়কে দিনের আলোতেই অস্ত্রের মুখে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা (মব জাস্টিস) আইনশৃঙ্খলার আরও অবনতি ঘটিয়েছে।
পুলিশের শিথিল টহলে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের কারণে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের আগের মতো দৃশ্যমান তৎপরতা বা কড়া নজরদারি নেই।
অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে বিভিন্ন সময়ে লুট হওয়া এবং সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়া।
আর্থিক সংকট ও মাদকের অর্থনৈতিক মন্দা এবং তরুণদের মধ্যে মাদকের মরণনেশা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা দ্রুত টাকা আয়ের জন্য ছিনতাই ও চুরিতে জড়িয়ে পড়ছে।
ভুক্তভোগী বলেন, নাসির উদ্দিন (ভোগড়া, গাজীপুরের বাসিন্দা), এখন সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়াই দায়। কিছুদিন আগে আমার এক প্রতিবেশীকে চান্দনা চৌরাস্তার কাছে চাকু দেখিয়ে মোবাইল আর বেতনের সব টাকা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। পুলিশকে জানালে তারা শুধু ডায়েরি (জিডি) লিখে রাখে, কিন্তু রাতে রাস্তায় কোনো পুলিশ ভ্যান দেখা যায় না। আমরা এখন ঘরের ভেতরেও নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতামতে ড. তৌহিদুল হক (সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ) অপরাধ বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি' বা দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হওয়া। পুলিশ প্রশাসন পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার পূর্ণ সুবিধা নিচ্ছে পেশাদার অপরাধী ও কিশোর গ্যাংগুলো। যতক্ষণ না পর্যন্ত পুলিশি টহল শতভাগ জোরদার হবে এবং চুরি-ছিনতাইকে ছোট অপরাধ হিসেবে না দেখে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে, ততক্ষণ এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য, (গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তা) আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। গত ছয় মাসেই গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় ১,৮৫৪টি মামলা হয়েছে এবং ৩,২১৭ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধ প্রবণ এলাকাগুলোতে আমাদের বিশেষ নজরদারি ও চেকপোস্ট বাড়ানো হচ্ছে। জুট ব্যবসা বা কারখানায় চাঁদাবাজির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
যৌথ অভিযান ও টহল বৃদ্ধিতে প্রতিটি থানা এলাকায়, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও অন্ধকার গলিগুলোতে র্যাব-পুলিশের যৌথ টহল এবং নিয়মিত চেকপোস্ট বসানো জরুরি।
অপরাধীদের কাছে থাকা অবৈধ বা লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
কমিউনিটি পুলিশিং স্থানীয় সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে এলাকাভিত্তিক নৈশ প্রহরী বা ‘ডিফেন্স পার্টি’ গঠন করা যেতে পারে।
মাদক সন্ত্রাসীদের নির্মূলে অপরাধের মূল উৎস মাদক কারবারিদের আস্তানাগুলো দ্রুত গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই সম্ভব গাজীপুরের অলিগলি এবং রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযানের মাধ্যমে মাদক, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা এবং চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক অপরাধ নির্মূল করা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
