× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

জাল সনদে চাকরির অভিযোগ, কাউনিয়ায় সাধু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ঘিরে তোলপাড়

কামরুল হাসান টিটু, রংপুর ব‌্যু‌রো

১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৫১ পিএম

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সাধু উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে অনীহার কথা বলা হলেও, স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ—সমস্যার মূল কারণ শুধু তাদের সন্তানদের অনিয়মিত উপস্থিতি নয়; বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, শিক্ষকদের দায়সারা দায়িত্ব পালন এবং পাঠদানের পরিবেশ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি কম—এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম কতটা কার্যকর, শিক্ষকরা নিয়মিত ও আন্তরিকভাবে পাঠদান করছেন কি না এবং শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়মুখী না হওয়ার পেছনে ব্যবস্থাপনার কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

এর মধ্যেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে জাল সনদ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন চাকরি করা, নিয়োগ বাণিজ্য, একক ক্ষমতার প্রয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তে নেওয়ায় বিদ্যালয়জুড়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ। তবে প্রধান শিক্ষক এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

স্থানীয় সূত্র ও বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত সাধু উচ্চ বিদ্যালয়টি ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ১২ জন। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত রয়েছেন চারজন। এছাড়া কর্মচারী রয়েছেন আরও পাঁচজন।

বিদ্যালয়ের নথিপত্রে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪২ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৪১ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৪৬ জন এবং নবম শ্রেণিতে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকার তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ চার শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী ১৫৯ জন। কিন্তু সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে নথিতে থাকা শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি অনেক কম দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—নথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কেন নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছে না?

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এর পেছনে অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে অনীহাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের দাবি, এলাকার অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানোর ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন নন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমের মতো প্রাকৃতিক কারণেও কোনো কোনো দিনে উপস্থিতি কম থাকে।

তবে স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবকের বক্তব্য ভিন্ন, তাদের অভিযোগ অনুযায়ী শিক্ষার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা পাচ্ছে না। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না, পাঠদান কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ কতটা—এসব বিষয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। অভিভাবকদের দাবি, শুধু শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির জন্য তাদের দায়ী করলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না; বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং পরিচালনা ব্যবস্থাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসছে না—এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে? অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না, ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা হয়েছে কি না এবং পাঠদানকে আকর্ষণীয় ও কার্যকর করতে শিক্ষকরা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০০৪ সালে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পছন্দের ব্যক্তিদের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম ও বাণিজ্য হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ, আসবাবপত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহলের কেউ কেউ।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে এলাকার কিছু অসাধু ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ তুলেছেন। চাকরিতে তার আরও প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় রয়েছে এবং তিনি কোনো অন্যায় করেননি বলেও দাবি করেন। তার নিয়োগ ও চাকরিসংক্রান্ত বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন বলে তার বিশ্বাস।

শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতির বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, অতিরিক্ত গরম ও বৃহস্পতিবার হওয়ায় ওই দিন উপস্থিতি কম ছিল। তবে পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক থাকে বলে দাবি করেন তিনি। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে তিনি তার সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছেন বলেও জানান।

তদন্ত কমিটির সদস্য একাডেমিক সুপারভাইজার দিল আফরোজ জানান, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তদন্ত কমিটির প্রধান দিতে পারবেন। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র গণমাধ্যমকর্মীরা দিতে চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া তা গ্রহণ করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাহের আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তদন্ত চলমান রয়েছে এবং যথাসময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। তবে তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।

এদিকে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাকের চাকরি ও অন্যান্য অভিযোগ-সংক্রান্ত সংগৃহীত কিছু নথিপত্র কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি নথিপত্র যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে সাধু উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে এখন দুটি বিষয় সমানভাবে আলোচনায় এসেছে—একদিকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর সত্যতা, অন্যদিকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতি ও শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের অসন্তোষ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত পাঠদানের চিত্র, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ এবং বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

তাদের দাবি, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের আগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত না করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ—তিন পক্ষেরই জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং বিদ্যালয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.