সংসারে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী। বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালান। মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে নামিদামি কোচিং কিংবা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ ছিল অনেকটাই দূরের বিষয়। কিন্তু দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি ফারজানা আক্তারের স্বপ্নের পথচলা। নিজের মেধা, অধ্যবসায়, শিক্ষকদের সহযোগিতা ও পরিবারের অনুপ্রেরণায় এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী। এর আগে অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিল সে।
ফল প্রকাশের দিন কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার আগ পর্যন্ত উৎকণ্ঠায় ছিল ফারজানা। পরীক্ষায় ভালো করার আত্মবিশ্বাস থাকলেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ হবে কি না, তা নিয়ে ছিল শঙ্কা। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের কাছ থেকে ফলের শিট হাতে নিয়ে নিজের ফল দেখার পর আনন্দে কেঁদে ফেলে সে। তার সেই কান্নায় মিশে ছিল দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও স্বপ্নপূরণের আনন্দ।
ফারজানার পরিবারে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকট। মেয়ের স্কুলের মাসিক বেতন পরিশোধ করতেও অনেক সময় বাবাকে কষ্ট করতে হয়েছে। সংসারের টানাপোড়েনের কারণে কোচিং কিংবা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ হয়নি তার। ফলে বাড়িতে নিজেই নিয়মিত পড়াশোনা করেছে। কোনো বিষয় কঠিন মনে হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েছে।
নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার সময় কঠিন বিষয়গুলোর কথা ভেবে কিছুটা ভয় কাজ করেছিল ফারজানার মনে। তবে পরিবারের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগই বেছে নেয় সে। সামান্য বেতনে কর্মরত বড় ভাই ছিলেন তার পড়াশোনার অন্যতম উৎসাহ। ভাইয়ের উৎসাহ, বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় কঠিন বিষয়গুলোও ধীরে ধীরে আয়ত্তে আনে ফারজানা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা নানা প্রতিকূলতাও তার নিয়মিত পড়াশোনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বিদ্যালয়ে মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করার পাশাপাশি বাড়িতে নিয়মিত অধ্যয়ন করাই ছিল তার সাফল্যের মূলমন্ত্র। নিজের পড়াশোনার প্রতি ছিল তার গভীর মনোযোগ ও দায়িত্ববোধ।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রাব্বানি বলেন, ‘ফারজানা অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। পড়ালেখার প্রতি তার আন্তরিকতা, শৃঙ্খলা ও ভালো আচরণ শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তাকে প্রিয় করে তুলেছিল। তার এই ফল আমাদের বিদ্যালয়ের জন্যও গর্বের।’
সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিদারুল আলম বলেন, ‘ক্লাসে মনোযোগী হওয়া এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চললে ভালো ফল করা সম্ভব। ফারজানা তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সে নিয়মিত ক্লাস করেছে এবং শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে পড়াশোনা করেছে। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’
মেয়ের এমন সাফল্যে আনন্দিত ফারজানার বাবা-মা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে তারা স্বপ্ন দেখেন, একদিন ফারজানা এমবিবিএস চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে।
ফারজানার স্বপ্নও একই। চিকিৎসক হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় সে। ফারজানা বলে, ‘আমার স্বপ্ন একজন চিকিৎসক হওয়া। মানুষের সেবা করতে চাই। বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। ভবিষ্যতে নিজের সাফল্যের মাধ্যমে তাদের সেই কষ্টের প্রতিদান দিতে চাই।’
অভাবের সংসারে থেকেও ফারজানার এই সাফল্য যেন আবারও প্রমাণ করল—সুযোগের সীমাবদ্ধতা স্বপ্নের পথে চূড়ান্ত বাধা নয়। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, নিয়মিত অধ্যয়ন, পরিশ্রম ও পরিবারের-শিক্ষকদের সহযোগিতা থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
