পাহাড়িয়া (পাহাইড়া) বলতেই এখানে কিছু অসঙ্গতিকে মনে করিয়ে দেয়। এর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষার আলো বঞ্চিত ও জীবনমান নিম্মমানের ইত্যাদি কথাগুলো অনায়েসেই চলে আসে। এমন একটি মহল্লা/পাড়ার নাম পাহাড়িয়াপাড়া। দ্বীপের ন্যায় পাড়ার দুই যুবক ও এক যুবতী মিলে একটি প্রাথমিক লেভেলের প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রত্যয় দীর্ঘদিনের হলেও স্বল্প পরিসরে শুরু করেন গত বছর থেকে। স্থানীয় ঐতিহ্যকে ধারন করতে নাম দিয়েছেন ‘পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল’। এ নাম দিয়েই পাড়ার সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনে উজ্জল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন উদ্যোক্তারা।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড়িয়াপাড়া এমন একটি জায়গা যেখানে বর্ষকালে একটি মাত্র প্রবেশ পথ থাকে। চারদিকে নিচু জমিতে পানিতে থই থই করে। এ পাড়ার পশ্চিমে এতিহ্যবাহী আখালিয়া নদী। নদীর উপারে আছিম পাটুলী ইউনিয়নের রামনগর গ্রাম। কাঁদা ও দুরত্ব সহ নানা বাঁধা বিপত্তির কারণেই এই পাড়ার ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ায় পিছিয়ে। আর পিছিয়ে পড়ার কারণেই এলাকার যোগাযোগ ক্ষেত্রের উন্নয়ন সহ সকল কিছু থেকে এখানকার বাসিন্দারা এগুতে পারে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সম্প্রতি ঐ এলাকায় শুনা যায় লেখাপড়ার আওয়াজ। বাচ্চারা গলা ফাটিয়ে লেখাপড়ার অক্ষর (অ, আ; ১,২; এ,বি,সি) বলছে, দৌড়াদৌড়ি করছে। সামনে এগুতেই ছোট কাঁচা রাস্তার পাশে ভিন্ন ডিজাইনে চোখে পড়ল ‘পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল’। বাহির থেকে কেউ এ পথ দিয়ে গেলে তাকে আকৃষ্ট করবে এ স্কুলের আর্ট।
গ্রামের শিশুদের স্বপ্নের ঠিকানা হয়ে উঠেছে মাটি, বাঁশ ও বেতের তৈরি একটি ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়। স্থানীয় সুমন মিয়া, সেলিম আহমেদ ও রেহেনা আক্তার গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করে ২৬ শতক জমি নিয়ে গড়ে তোলেন এ প্রতিষ্ঠান। তাদের পাশে সহযোগি হিসাবে পেয়েছেন গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশন (বাংলাদেশের একটি অলাভজনক ও সরকারি অনুমোদিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন)।
আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়নের দৃঢ় প্রত্যয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে রঘুনাথপুর পাহাড়িয়াপাড়া গড়ে ওঠা ‘পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল’ বদলে দিচ্ছে গ্রামের শিক্ষার চিত্র। বিদ্যালয়টির প্রধান ফটক বাঁশের, দেয়াল প্রায় ২০ ইঞ্চি পুরু মাটির, ছাউনিতে রয়েছে মাটির টালি। মেঝেও মাটির। দরজা বাঁশের, জানালা বেতের। শিক্ষার্থীদের বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে মাঠের দোলনাও তৈরি হয়েছে বাঁশ দিয়ে। প্রাকৃতিক উপকরণে নির্মিত এই বিদ্যালয় এখন দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হিসেবে সবার নজর কাড়ছে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরের রাধাকানাই ইউনিয়নের পাহাড়িয়াপাড়ায় দীর্ঘদিন কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। সবচেয়ে কাছের সরকারি বিদ্যালয়টি প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় বর্ষাকালে কাদাময় পথ পেরিয়ে শিশুদের স্কুলে যাওয়া ছিল দুরূহ। ফলে অনেক শিশু বিদ্যালয়ের বাহিরেই থেকে যেত। ২০২০ সালে প্রাথমিক আলোচনা হলেও ২০২৪ সালে গ্রামবাসী বাঁশ, মাটি, শ্রম ও সময় দিয়ে বিদ্যালয় নির্মাণে অংশ নেন। ২০২৫ সালে শুরু হয় পাঠদান।
বিদ্যালয়ের প্রধান সমন্বয়ক সেলিম আহমেদ বলেন, এলাকার ঐতিহ্য ধরে রাখতেই মাটির ঘরের আদলে বিদ্যালয়টি নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অংশগ্রহণেই বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। বাঁশের বেঞ্চ ও পাটের ব্যাগও স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের অংশ।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মোট ৫৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পাঠদান চলে। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক ১০০ টাকা, প্রথম শ্রেণির জন্য ১২০ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য ১৪০ টাকা বেতন নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের এই ফি এবং ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৯০ ভাগ।
গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাদিয়া জাফরিন বলেন, প্রচলিত ভবনের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম ব্যয়ে বিদ্যালয়টি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে প্রায় দুই হাজার টন কার্বন নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের তাপমাত্রাও সাধারণ ভবনের তুলনায় প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে।
রাধাকানাই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. তোফাজ্জল হোসেন নয়ন বলেন, ‘পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল’ শিশুদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তবে রিমোর্ট এরিয়া বিবেচনায় ভবিষ্যতে এখানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। উদ্যোক্তারা যোগাযোগ করলে শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
