ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
পাহাড়ের সবুজে, মেঘের ভাঁজে আর নদী-ঝরনার ছন্দে গড়ে উঠেছে বান্দরবান। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি এ জেলার অন্যতম বড় পরিচয় এখানকার মানুষের বৈচিত্র্য। একই পাহাড়ের বুকে বসবাস করেও ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, সামাজিক রীতি ও জীবনধারায় রয়েছে ভিন্নতা।
বান্দরবানে বসবাসরত ১১টি জনগোষ্ঠীর মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, খুমি, খেয়াং, চাক, চাকমা, পাংখোয়া, লুসাই, তঞ্চঙ্গ্যা। তাদের নিজ নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে টিকে আছে। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের ধারা। শত শত বছর ধরে পাহাড়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু বসবাসের নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের জীবন, জীবিকা, বিশ্বাস, উৎসব ও সংস্কৃতি। পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন তাদের জীবনধারাকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি তাদের সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে পাহাড়ের পরিবেশকে ঘিরে।

বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা তাদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবের সময় ফুটে ওঠে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও নৃত্য-গীতের বৈচিত্র্য। কোথাও সাংগ্রাই, কোথাও বৈসু, কোথাও নিজস্ব সামাজিক ও ধর্মীয় আচার—বছরজুড়ে নানা উৎসব ও আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে পাহাড়ি জনপদ।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে এই ঐতিহ্যগুলোও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। আধুনিক জীবনযাপন, প্রযুক্তির বিস্তার, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের জীবনধারায় পরিবর্তনের কারণে কিছু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিজস্ব মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে আলোচনায় রয়েছে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস এলেই সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়। অনেক জনগোষ্ঠীর মানুষের দাবি, তাদের জাতিসত্তা ও আত্মপরিচয়ের সাংবিধানিক ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হোক।
তবে 'আদিবাসী' পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশে সরকারি পরিভাষা ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান ও সরকারি নীতিমালায় 'আদিবাসী' শব্দের পরিবর্তে 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী', 'নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী' বা 'উপজাতি' পরিভাষা ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে পাহাড়ের অনেক মানুষের কাছে 'আদিবাসী' পরিচয় তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিচয়ের এই আলোচনা তাই শুধু একটি শব্দের ব্যবহার নিয়ে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও অধিকার। পাহাড়ের মানুষের প্রত্যাশা তাদের বৈচিত্র্য যেন কেবল পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবে দেখা না হয়। বরং প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় যথাযথ মর্যাদা পাক।
বান্দরবানের পাহাড় তাই শুধু সবুজের গল্প নয়। এটি ১১টি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনধারার এক বহুমাত্রিক ক্যানভাস। ভিন্নতা এখানে বিভাজন নয়; বরং এই ভিন্নতাই পাহাড়ের সৌন্দর্য ও পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। তাই পাহাড়ে বৈচিত্র্য টিকে থাকুক, টিকে থাকুক ১১টি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। কারণ এই বহুত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বান্দরবানের আলাদা পরিচয়। তাই আদিবাসী দিবসে সাংবিধানিক ভাবে পাহাড়ে মানুষের পরিচয় ফিরিয়ে দিক সেই প্রত্যাশা পাহাড়ের বসবাসরত জনগোষ্ঠীর।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভুমি অধিকার সংরক্ষণে আন্দোলনের বান্দরবানে চ্যাপ্টার সভাপতি জুম লিয়ান আমলাই বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন চুক্তির বাস্তবায়ন। সে আলোকে ধরে পাহাড়ের আদিবাসীরা নিজ পরিচয় বহন যেমন করতে পারবে তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন দিকে ধাবিত হবে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামে সভাপতি ডা: মং উষাথোয়াই বলেন, পাহাড়ের ১১টি জাতিগোষ্ঠীর যে যার ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু সেসব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সাংবিধানিক স্বীকৃতি। কিন্তু কিছু মহল সেটিকে অন্যদিকে মোড়ানো জন্য ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার এটিকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ফিরিয়ে দিবেন বলে আমরা আশা রাখি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএস মং বলেন, পাহাড়কে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এখানকার জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও মতামত নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে পাহাড়ের মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে তাদের বাস্তবতা ও প্রত্যাশাগুলো আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
