নীলফামারী সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের পূর্ব সুটিপাড়া পাহারের মোড় এলাকায় গভীর রাতে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর ও পরিকল্পিত লুটপাটের অভিযোগে জড়িতদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
রোববার (২৬ জুলাই) বিকেলে আয়োজিত এ মানববন্ধনে কয়েক শতাধিক নারী-পুরুষ অংশ নেন। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, গত ২৫ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল পূর্বপরিকল্পিতভাবে এলাকায় প্রবেশ করে একাধিক বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এ সময় ঘরবাড়ি ও দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট এবং নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন তারা।
মানববন্ধনের ব্যানারে লেখা ছিল, “২৫ জুলাই গভীর রাতে বেআইনি অনুপ্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর ও পরিকল্পিত লুটতরাজের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন।” কর্মসূচির আয়োজন করেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
মানববন্ধনে ভুক্তভোগীরা তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরেন। ভুক্তভোগী বৃষ্টি বেগম অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার মুদি দোকান ও বসতবাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে ক্যাশবাক্স থেকে ২০ হাজার টাকা, ঘরে থাকা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। এছাড়া দোকান ও বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুরে আরও প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগী বাবু ইসলাম বলেন, তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে নগদ অর্থ ও প্রায় দেড় লাখ টাকার স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। পাশাপাশি দরজা-জানালা ও ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়।
মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার সুজুকি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে, বাড়ির দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র তছনছ করে এবং শোকেসে রাখা দুই লাখ টাকা নিয়ে যায়। এতে তার প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন।
এছাড়া মমিনুর, আতিকুল, আনারুল ইসলাম, মানিক, আতাউর রহমান, মন্নুজা বেগম, নিলুফা বেগম ও মো. জিয়াসহ আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়েছে। একই সঙ্গে বসতঘর ও আসবাবপত্রে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।
মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়, হামলার সময় মোকসেদ আলীর স্ত্রী মেনু বেগম হামলাকারীদের মারধরে গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নারী ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাড়িতে পুরুষ সদস্যদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে হামলাকারীরা কয়েকজন নারীর শ্লীলতাহানিও করেছে। এ অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, হামলার সময় বাড়িতে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হলেও ক্যামেরায় হামলার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ ধারণ হয়েছে। ওই ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্তের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এলাকায় অতীতে মাদকসংক্রান্ত কিছু সমস্যা থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি ও প্রশাসনের উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তারা সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, মাদক নির্মূলের নামে নিরীহ মানুষের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট কিংবা নারীদের হয়রানির অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পাশের এলাকায় মাদকসংক্রান্ত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল বলে তারা শুনেছেন। তবে যে কারণেই ঘটনা ঘটুক না কেন, নিরপরাধ মানুষের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে, কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে ধমক ও ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তারা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নীলফামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, “পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে ধাক্কা বা ধমক দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল তথ্য।”
ওসি আরও বলেন, “ওই এলাকাটি মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মাদক নির্মূল কমিটি এবং প্রকৃত মাদক কারবারিদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তবে বাড়িতে হামলা বা লুটপাটের বিষয়ে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সংবাদ পেয়ে আমি ও নীলফামারী সদর সার্কেলের কর্মকর্তাসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের দাবি, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর, আহত, নারীদের শ্লীলতাহানি এবং সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীদের একাধিক গুরুতর অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় স্থানীয়দের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনই এ ঘটনার গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে।