× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

চড়া সুদে ঋণের টাকায় গড়া বাগানের হাজারেরও বেশি কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ

মো: আব্দুল কাইয়ুম, মৌলভীবাজার:

২০ জুলাই ২০২৬, ১৯:০২ পিএম । আপডেটঃ ২০ জুলাই ২০২৬, ১৯:৫০ পিএম

ছবি: সংবাদ সারাবেলা।

আর মাত্র কিছুদিন পরই মৌসুমের শুরুতে রসে টলমল পাকা কমলাগুলো কাটার কথা ছিলো। ভাল ফলন আর লাভের আশায় দিন গুনছিল কমলার বাগান গড়ে তোলা কৃষক। এই বাগান ঘিরেই তাদের পরিবারে হাসি ফোটানোর অবলম্বন। এর মধ্যেই ঘটে বিপত্তি। সরকারি বনের জায়গায় গড়ে তোলা ওই কমলা বাগানটিতে ৮ বছর ধরে চাষ করা হচ্ছে কমলা। আর তা সম্ভব হচ্ছে নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই। কিন্তু এবার মাসোহারার টাকা পরিশোধ না করাই কাল হলো কৃষক মোছা. সালমা বেগমের। এমনই অভিযোগ কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায় ৮ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা কমলা চাষি সালমা বেগমের।

সরেজমিন সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায় বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানের নামে একটি পরিবারের প্রায় ১হাজার ২শত ফলস্ত কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, গত আট বছর ধরে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা (চাঁদা) দেওয়ার পরও এবার আর্থিক সংকটের কারণে টাকা দিতে না পারায় প্রতিশোধমূলকভাবে তাদের সাজানো বাগান ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

'৮ বছর চাঁদা নিল, ফল ধরার সময় গাছ কাটল কেন?' স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বাগানটি অবৈধই হয়ে থাকে, তাহলে রোপণের সময় বা এক-দুই বছরের মধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? আট বছর ধরে গাছ বড় হতে দেওয়া হলো, আর ফল ধরার সময়ই কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো? ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুরু থেকেই তারা বন বিভাগের বন বিট  কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এবার পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে সেই টাকা দিতে না পারায় তাদের পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।

কমলা চাষি মোছা. সালমা বেগম বলেন, এই বাগান গড়ে তুলতে গত আট বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নিজের টাকা নয়, বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই টাকা বাগানে খাটিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার ফল বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করব। অথচ বন বিভাগ আমাদের সব শেষ করে দিল। বাগান না কেটে যদি আমাদের ঘরে তালা দিয়ে পুড়িয়ে মারত, তাহলেও এত কষ্ট হতো না। এখন এই ঋণের বোঝা নিয়ে আমরা কোথায় যাব? কীভাবে ঋণ শোধ করব?
দুই হাত মাথায় দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। ১৫-২০ লাখ টাকার বিনিয়োগ, ২৫-২৬ লাখ টাকার ফলনের আশা।

সালমা বেগম ও তাঁর স্বামী আলিম উল্লা জানান, বনের প্রায় ১০ কিয়ার (কানি) জমিতে দীর্ঘ আট বছর ধরে কমলা, পেঁপে ও লাউয়ের বাগান গড়ে তোলেন তারা। বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ঋণ বিনিয়োগ করা হয় এই বাগানে। তাদের দাবি, আরও প্রায় তিন মাস পর বাগান থেকে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করে ঋণের বড় একটি অংশ পরিশোধ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বন বিভাগের অভিযানে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে।

বৃদ্ধা শাশুড়ির অভিযোগ: 'টাকা দিতে পারিনি বলেই এই শাস্তি' সালমা বেগমের শাশুড়ি আলেকজান বিবি বলেন, আমরা তো চোর-ডাকাত নই। কষ্ট করে গাছ বড় করেছি। প্রতিবছর বন কর্মকর্তাদের নিয়ম করে মাসোহারা দিয়েছি। কিন্তু এবার তারা বেশি টাকা চাইলে আমরা দিতে পারিনি। টাকা দিতে না পারার কারণেই আমার ছেলের বউয়ের স্বপ্ন এভাবে কেটে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এনজিওর লোকজন কিস্তির জন্য এলে আমরা কী জবাব দেব?"

প্রতিহিংসামূলক অভিযানের অভিযোগ স্থানীয়দের, সরকারি জমি উদ্ধারের নামে এই অভিযান পরিচালিত হলেও এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। কয়েক দিন আগে বন বিভাগের কথিত লিজ বাণিজ্য ও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশের সময় ভুক্তভোগী পরিবার সাংবাদিকদের কাছে এসব তথ্য তুলে ধরেছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের দাবি, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে বনের জমি বনায়নের নামে টাকার বিনিময়ে অলিখিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পান ও জুম চাষের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছেন। অথচ সেইসব জায়গায় কোনো অভিযান না চালিয়ে শুধু এই পরিবারের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে।

সেচ মেশিনও ভাঙচুরের অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের, শুধু গাছ কেটেই ক্ষান্ত হয়নি অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। তাদের একমাত্র পানি সেচের মেশিনটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে, যাতে অবশিষ্ট গাছগুলোও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, "টাকা দিলে একটি বাগান আট বছর ধরে বৈধ থাকে, আর টাকা না দিলেই রাতারাতি অবৈধ হয়ে যায় কীভাবে?"

ধ্বংস্তুপে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সরেজমিনে কালিঞ্জি এলাকার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কাটা কমলা গাছের ডালপালা। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাগানের মাঝখানে নির্বাক বসে ছিলেন সালমা বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ঋণের কিস্তি, সংসারের ভবিষ্যৎ এবং জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

রাজকান্দি রেঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষক রেঞ্জ কর্মকর্তা  প্রীতম বড়ুয়া বলেন, মাসোহারা নেয়ার অভিযোগ আমরা পাইনি। এখন শুনছি তাদের ৮বছরের যে লিজ এবং টাকা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে সেটা যদি তারা আমাদের যথাযত কর্তৃপক্ষকে লিখিত জানায় তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখন আমরা জবরদখল থেকে উচ্ছেদ করেছি আর কোন কিছুই নাই। এখন জায়গাটি দ্রæতই বনায়নের দিকে যাবে।

এ বিষয়ে সিলেট বন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান এর মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। 

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.