× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

উন্নয়নের আগ্রাসনে সংকুচিত চলনবিল ,কমছে আয়তন

জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ আর জলপ্রবাহ হারিয়ে ধুঁকছে দেশের বৃহত্তম বিল

মো. সোহাগ আরেফিন,গুরুদাসপুর(নাটোর)

০৮ জুলাই ২০২৬, ১৬:২৯ পিএম

“বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম”—একসময় এই প্রবাদই ছিল চলনবিলের প্রকৃত পরিচয়। বর্ষা এলে দিগন্তজোড়া জলরাশি যেন আকাশের সঙ্গে মিশে যেত। উত্তাল ঢেউ, নৌকার বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ, জেলেদের ব্যস্ততা, অতিথি পাখির কোলাহল আর অসংখ্য দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার—সব মিলিয়ে চলনবিল ছিল উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতির এক জীবন্ত মহাকাব্য।

আজ সেই মহাকাব্যের পাতা যেন ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির বুকে উন্নয়নের ছাপ যত গাঢ় হচ্ছে, ততই সংকুচিত হচ্ছে চলনবিলের আয়তন। হারিয়ে যাচ্ছে পানির স্বাভাবিক গতির  প্রবাহ, কমছে গভীরতা, বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় মাছ, আর অনিশ্চয়তায় পড়ছে বিলকেন্দ্রিক লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা।

একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে বিস্তৃত ছিল চলনবিল। বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে বিস্তৃত এই জলাভূমি।

গবেষণা ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র বলছে, একসময় চলনবিলের আয়তন ছিল এক হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। বর্তমানে বর্ষাকালে জলাবৃত অংশ নেমে এসেছে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে, আর শুষ্ক মৌসুমে তা মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারের মতো। কয়েক দশকের ব্যবধানে এ বিশাল জলাভূমি হারিয়েছে তার বিস্তীর্ণ পরিধি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এক সময়  ব্রহ্মপুত্র নদ তার গতিপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেওয়ার পরই চলনবিলের সৃষ্টি । শত শত বছর ধরে এই বিল উত্তরাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আশ্রয়স্থল হিসেবে টিকে আছে।উন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রয়োজন।কিন্তু পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন যখন প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথকে রুদ্ধ করে, তখন তার মূল্য দিতে হয় প্রকৃতিকেই।১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের পর চলনবিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পরে ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া  মহাসড়ক নির্মাণে বিলের বুক চিরে আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত চলনবিল এলাকায় নির্মিত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৮৮ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার, ২১টি স্লুইসগেট এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ। 

এছাড়া সিংড়া এলাকায় পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথের ওপর গড়ে তোলা হয়েছে হাইটেক পার্ক ও আইটি ইনকিউবেশন সেন্টার।এসব অবকাঠামো উন্নয়ন মানুষের যোগাযোগ সহজ করলেও, বহু জায়গায় পানির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা, কোথাও আবার শুকিয়ে গেছে বিলের বিস্তীর্ণ অংশ।

গত এক যুগে চলনবিলজুড়ে খনন করা হয়েছে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের নামে এসব পুকুর অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বর্ষার পানি আটকে থাকছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে চলনবিল তার প্রাকৃতিক চরিত্র পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে পারে।

চলনবিল একসময় ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম বৃহৎ প্রজনন ক্ষেত্র। বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, পাবদা, টেংরা, মাগুর, শিং, কই, টাকি, আইড়, বাইন, পুঁটি, মলা, খলসাসহ অসংখ্য দেশীয় মাছের অফুরন্ত প্রাচুর্য ছিল এখানে।

চলনবিলের ৪৭টি নদ-নদী ও অসংখ্য খাল-বিলকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্ষা মৌসুমে ধরা মাছ দিয়ে সারা বছরের সংসার চলত তাদের। এখানকার দেশীয় শুঁটকি মাছ বিদেশেও রপ্তানি হতো।কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের অবাধ ব্যবহারে মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কমেছে মাছের উৎপাদন, বন্ধ হয়ে গেছে অনেক শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র, আর বহু জেলে বাধ্য হয়েছেন পেশা পরিবর্তন করতে।

চলনবিলে রয়েছে ৪৭টি নদ-নদী এবং ৭১টি খাল-নালা। এসব জলপথ দিয়েই বড়াল, আত্রাই ও গুমানী নদীর মাধ্যমে পদ্মা ও যমুনার পানি বিলে প্রবেশ করত।কিন্তু পলি জমে অধিকাংশ নদী ও খাল আজ নাব্যতা হারিয়েছে। 

বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪১০ কিলোমিটার খাল-নালার মধ্যে ৩৬৮ কিলোমিটারই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ, জলাভূমি ভরাট, পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে চলনবিলের আয়তন দিন দিন কমছে। একই সঙ্গে অবৈধ জালের ব্যবহারে দেশীয় মাছও বিলুপ্তির পথে।

নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ চলনবিল সংকুচিত হওয়ার প্রধান কারণ। তিনি মনে করেন, বিলের ভেতরের খাল-নালা পুনঃখনন, পলি অপসারণ এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে চলনবিলকে রক্ষা করা সম্ভব।#

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.