ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির বর্তমান বেহাল দশা এতটায় করুন হয়েছে যে, সারা দিনেও দুই তিনজন গুনী নির্মাতা সমিতিতে আসেনা। সমিতির বেহাল এই দশার সৃষ্টি করেছে চলচ্চিত্র পরিচালক শাহীন সুমন ও শাহীন কবির টুটুল।
বিএফডিএ এওয়ার্ড বাণিজ্য করে প্রতিবছর এই সিন্ডিকেট হাতিয়ে নেয় কোটি টাকা। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চলচ্চিত্র পরিচালক হয়রানির শিকার হয়েছেন শাহীন টুটুলের কাছে। এইবার প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন গুণী চলচ্চিত্র পরিচালক বদিউল আলম খোকন, তিনি বহু ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের পরিচালক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক মহাসচিব। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অঙ্গনের পরিচিত মুখ মেধাবী চলচ্চিত্র পরিচালক মনজুরুল ইসলাম মেঘ, এফডিসিতে মেঘ অন্যায়ের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। জুলাই আহত ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক রিয়াজুল রিজু।
এই তিন গুনী চলচ্চিত্র পরিচালক অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির ডিন্ডিকেট মুক্ত, বিতর্কিত বিএফডিএ এওয়ার্ড বাণিজ্য বন্ধ এবং আদালতের আদেশ অমান্য করে অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের বিরধীতাকারীরা সমিতি দখল করে রেখেছে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ তারা দীর্ঘদিন যাবত করে আসতে ছিলেন।
গতকাল ৪ জুলাই এফডিসিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির একটি সাধারণ সভার করেছে শাহীন সুমন ও শাহীন কবির টুটুল সিন্ডিকেটের অল্প কিছু পরিচালক। সেখানে তারা একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে চলচ্চিত্র পরিচালক বদিউল আলম খোকন, মনজুরুল ইসলাম মেঘ, রিয়াজুল রিজু কে আজীবন বহিষ্কার করার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরে নিন্দার ঝড় বইছে।
অভিযোগ উঠেছে শাহীন সুমন ও শাহীন কবির টুটুল এর নেতৃত্বে যে কমিটি এই গুণী তিন নির্মাতার সদস্যপদ বাতিল করেছে, তাদের কমিটি আদালত কর্তৃক বৈধতা পায়নি, আদালতে মামলা চলমান। এছাড়াও অভিযোগ আছে শাহীন সুমনের নামে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) ৩২ লাখ টাকার বকেয়া মামলা করেছে, সেটিও চলমান। শাহীন কবির টুটুলের নামে অভিযোগ তিনি ইউটিউবারদের টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সদস্য করে নিজের ভোট বৃদ্ধি করে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অর্থ। এছাড়াও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নাম ব্যবহার করে তথাকথিত বিএফডিএ এওয়ার্ড বাণিজ্য করে সমিতির অর্থ তসরুপ করেছে টুটুল।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকে ২০২৩ সালে শাহীন সুমন ও শাহীন কবির টুটুলের নেতৃত্বে গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করলে অরাজনৈতিক পরিচালক সমিতি রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে গড়ে উঠে। যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির গঠনতন্ত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম যুক্ত করে শাহীন সুমন ও শাহীন কবির টুটল। যে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে কাজ করতো, সেই সংগঠন রাতারাতি আওয়ামী সংগঠনে রুপ দেয় শাহীন সুমন। সাধারণ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট আন্দোলনের সময় ৩ আগস্ট এফডিসিতে চলচ্চিত্র পরিচালক শাহীন সুমন ও চলচ্চিত্র প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে একটি মানববন্ধন করে জুলাই আন্দোলনের কর্মীদের শাস্তি দাবি করে ছিলো যে সিন্ডিকেট তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বদিউল আলম খোকন, মনজুরুল ইসলাম মেঘ।, রিয়াজুল রিজু।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তেনর পরে, পলাতক ছিলো খসরু, শাহীন সুমন, টুটুল । কিন্তু ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহন করে জুলাই আন্দোলনের বিরধীতাকারী একাধিক পরিচালক। বিএনপি পন্থি চলচ্চিত্র পরিচালকরা নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে, চলচ্চিত্র পরিচালক মনজুরুল ইসলাম মেঘ এর নেতৃত্ব নির্বাচন বয়কটের ডাক দিলে ২৭ ডিসেম্বর নির্বাচন স্থগিত হয়, এর পরে ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হলে আবারো নির্মাতা মনজুরুল এর প্রতিবাদে নির্বাচন স্থগিত হয়। এফডিসিতি থেকে নির্বাচনের ভেন্যু জাতীয় প্রেস ক্লাবে করা হলে, জাতীয় প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষ যখন জানতে পারলেন, পরিচালক সমিতির নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে জুলাই আন্দোলনের বিরধীতাকারী ফ্যাসিস্ট দোসরেরা, তখন ভেন্যু বাতিল করে।
সংগঠনের গঠনতন্ত্র অমান্য করে এক তরফে নির্বাচনের ষড়যন্ত্র হলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সকল সদস্যদের পক্ষ থেকে সমিতির সাবেক মহাসচিব বদিউল আলম খোকন আদালতে মামলা করলে আদালত ৭ কার্য দিবসের জন্য নির্বাচন স্থগিতাদেশ দেয়। আদালতে আদেশ অমান্য করে শাহীন সুমন ও শাহীন কবির চুটুল একতরফা নির্বাচন করে সমিতির চেয়ার দখল করলে আদালত কার্যক্রমে নিষেধা দেয়। আদালতের নিষেধ অমান্য করে তথাকথিত বিএফডিএ এওয়ার্ড বাণিজ্য করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে শাহীন টুটুল।
আগামি ১২ জুলাই আদালতে মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারন হয়ে আছে, তার আগেই গঠনতন্ত্র অমান্য করে একটি সাধারণ সভায় তিন পরিচালকে বাদ দিয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায়। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোন সদস্যকে বহিষ্কার করতে হলে প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে, তারপরে অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থন করে উত্তর দেবার পরে বহিষ্কার করা বা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে। কিন্তু গুনী এই তিন পরিচালকের ক্ষেত্রে সেটি করেনি পরিচালক সমিতি। সাধারণ সভার আলোচ্য বিষয়ে ছিলোনা কোন সদস্যের পদ বহিষ্কারের বিষয়ে।
চলচ্চিত্র মহলের একাধিক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন যে কমিটির নিজের বৈধতা নেই সেই কমিটি অবৈধ ভাবে কাউকে বহিস্কার করতে পারেনা। এটি সুনাম হানিফ জন্য করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন অনেকে।
ভুক্তভোগী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক রিয়াজুল রিজু জানিয়েছেন তিনি মানহানির মামলা করবেন। চলচ্চিত্র পরিচালক বদিউল আলম খোকন বলেছেন, এই কমিটি বৈধ নয়, এদের কোন কার্যক্রম বৈধতা পাবেনা।
এই ব্যাপার চলচ্চিত্র পরিচালক শাহীন কবির টুটুল এর সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি জানিয়েছেন, আসলে হঠাৎ কি ভাবে এটা হয়ে গেলো, সাধারণ সভার কার্যক্রমে যে বিষয় ছিলো না সেটি কেনো হুমসিকলী তুলে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্ট হলো, যা গঠনতন্ত্র বিরোধী, আমরা সমাধানের চেষ্টা করতেছি। টুটুল আরো জানিয়েছেন প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু বক্তিতার পরে একটি আবেগের বসে এই ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য বাংলাদেশ আওয়ামী চলচ্চিত্র লীগের সহ সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষ গণহত্যার ইন্ধন দিয়ে মানবন্ধন করেছিলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনিয়র এক চলচ্চিত্র পরিচালক জানিয়েছেন, যে তিন জন পরিচালকের সদস্যপদ পদ বাতিল করা হয়েছে তারা পরিচালক সমিতির অবৈধ কার্যক্রম ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় জুলাই আন্দোলনের বিরধী শাহীন সুমন ও শাহীন কবির টুটুলের ব্যক্তি আক্রোশের শিকার হয়েছে।
সারোহী নামের এক ব্যক্তি ফেসবুক পোষ্টে লিখেছেন, কিছু সংখ্যক উশৃংখল ও মৌলবাদ পরিচালকের প্ররোচনায় শাহীন-টুটুল কমিটির এমন রূঢ় পদক্ষেপ নেয়া সঠিক ও সময়োপযোগী হয়নি। জুলাই মাসে জুলাইয়ের সৈনিকের বিরুদ্ধে দাড়ানোর কারণে অতীত ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটির সুযোগ করে দিবে। এটি সমীচীন নয়। ক্রান্তিকালীন সময়ে ঐক্যবদ্ধ থাকাটাই জরুরি। সমিতির ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে যায় না। ভুল পথে যে কেউ হাঁটতে পারে, তাই বলে সমিতি কেন হাঁটবে? কেন মানুষের মনে বৈধতা অবৈধতা নিয়ে প্রশ্ন জাগবে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি কর্তৃক চলচ্চিত্র পরিচালক বদিউল আলম খোকন, মনজুরুল ইসলাম মেঘ এবং রিয়াজুল রিজুকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এই তিন পরিচালকের সদস্যপদ স্থায়ীভাবে বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সমিতি। তবে এই চরম সিদ্ধান্তের আগে তাঁদের কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ জানানো হয়নি কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম সুযোগও দেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, পরিচালক সমিতির বর্তমান কমিটির বৈধতা নিয়েও বর্তমানে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
