× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা

৩০ মে ২০২৬, ০৯:০১ এএম

পবিত্র ঈদ উল আজহা দেশের চামড়া শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। প্রতি বছর সংগৃহীত মোট চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ এই সময়েই সংগ্রহ করা হয়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ শিল্পের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

একইসঙ্গে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এতিমখানা, মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও অসহায় মানুষের অধিকার। কিন্তু সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে একদিকে যেমন জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রথমবারের মতো একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে। *“আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার মোদের দেশ গড়ার”* এই প্রত্যয়কে ধারণ করে বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয় স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যদের
:

চামড়ার গুণগত মান রক্ষা এবং সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে প্রথমেই প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী রেঞ্জের আওতাধীন ২৯টি জেলায় সর্বমোট ৪ হাজার ১৫৩ জন ভিডিপি সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রশিক্ষণে চামড়া ছাড়ানোর সঠিক পদ্ধতি, পরিষ্কারকরণ, নির্ধারিত মাত্রায় লবণ প্রয়োগ, ভাঁজ ও সংরক্ষণ, দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভিডিপি সদস্যরা পরে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করেন এবং স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে চামড়া সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেন।

চামড়া সংগ্রহে মাঠপর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা

ঈদের দিন কোরবানির শুরু থেকেই স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার কোরবানির স্থানে উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করেন।


পশু জবাইয়ের পর তারা সাধারণ মানুষকে সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ দেন। চামড়ায় যেন কোনো আঁচড়, ছিদ্র বা ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়। ধারালো ও সামান্য বাঁকানো ছুরি ব্যবহার, সঠিকভাবে দাগ কাটা এবং ধীরে ধীরে চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে তারা বাস্তবভিত্তিক সহায়তা প্রদান করেন।

চামড়া পরিষ্কার ও সংরক্ষণে সচেতনতা

চামড়া ছাড়ানোর পর তা সরাসরি রোদে না রেখে ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। চামড়ায় লেগে থাকা মাংস, চর্বি, রক্ত ও ময়লা পরিষ্কার করার কাজেও ভিডিপি সদস্যরা সহায়তা করেন।
সঠিকভাবে পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করা হলে চামড়ার গুণগত মান দীর্ঘসময় অক্ষুণ্ণ থাকে এবং বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়—এই বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতেও তারা ভূমিকা রাখেন।

সঠিক মাত্রায় লবণ প্রয়োগে গুরুত্ব

চামড়া সংরক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো নির্ধারিত মাত্রায় লবণ প্রয়োগ। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার না করায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।
এই কারণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভিডিপি সদস্যরা একটি মাঝারি বা বড় গরুর চামড়ার জন্য ৮ থেকে ১০ কেজি এবং ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার জন্য ২ থেকে ২.৫ কেজি লবণ ব্যবহারের পরামর্শ দেন।


তারা নিশ্চিত করেন, লবণ যেন চামড়ার ভেতরের অংশে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং ব্যবহৃত লবণে কোনো ধরনের ভেজাল বা অপদ্রব্য না থাকে। পাশাপাশি চামড়া সঠিক নিয়মে ভাঁজ করা ও দূষণ প্রতিরোধেও তারা সহায়তা প্রদান করেন। বিশেষত বিভিন্ন স্হানীয় জেলা /উপজেলায় ষ্টোরিং পয়েন্টে এবং এতিমখানার চামড়া স্তুুপে যথাযথ লবন প্রয়োগে ব্যাপক ভুমিকা রাখে। যা, পরবর্তীতে সময় নিয়ে ঢাকার ট্যানারী সংগ্রহকেন্দ্রে পাঠানোর ক্ষেত্রে চামড়ার গুণগত মান বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

পরিবহন ব্যবস্থাপনায়ও সক্রিয় অংশগ্রহণ

চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পর তা দ্রুত ট্যানারি বা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ঈদের দিন পরিবহন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তবে স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা স্থানীয়ভাবে পরিবহন ব্যবস্থা সমন্বয়, সতর্কতার সঙ্গে চামড়া গাড়িতে তোলা এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও তৃণমূল পর্যায়ে আনসার ভিডিপি সদস্যদের স্বেচ্ছাসেবকের ভুমিকায় সরব উপস্থিতি ৪টি বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে চামড়া সংগ্রহে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত


খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী—এই ৪টি রেঞ্জের আওতাধীন ২৯টি জেলায় সর্বমোট ৪,১৫৩ জন প্রশিক্ষিত ভিডিপি সদস্যদের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে ভিডিপি প্লাটুনের সদস্যদের এই স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ বদলে দিয়েছে প্রতিবারের চামড়া নিয়ে অনিশ্চতার গল্প। অতি অল্প সময়ের পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে কোরবানীর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ভিডিপি সদস্যদের দ্রুততার সাথে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আগামীতে ব্যাপক আকারে বিস্তৃত মোতায়েন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক বড় পরিবর্তন সূচিত করেছে। দেশের ৬০ লাখ স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যের এই সম্ভাবনা দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিবর্তনে এক নতুন সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। চামড়া শিল্পের এই সেক্টরে প্রয়োজন বিশাল ও বিস্তৃত এক নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেই সক্ষমতা এতদিন কেউ সেই অর্থে কাজে লাগাইনি। দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত এই শক্তিশালি নেটওয়ার্ক পর্যায়ক্রমে দেশের সকল জেলায় কাজে লাগানো সম্ভব হলে শুধু চামড়া শিল্প নয়, রাষ্ট্রের যেকোন প্রয়োজনে তা হয়ে ওঠবে এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

*শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই সম্ভাবনার কথা উপলব্ধি করে তাঁর “Peoples Warfare Doctrine”* ধারণার আলোকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি)। সময়ের বিবর্তনে ৬০ লক্ষের এই বিশাল বাহিনী সক্ষমতার মানদন্ডে একদিকে যেমন নতুন মাত্রায় উপনীত হয়েছে ঠিক তেমনি সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নে দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছ থেকে অর্জন করেছে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি জাতীয় সম্পদ রক্ষা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সবসময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে, এ প্রচেষ্টা তারই অংশ। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ভিডিপি সদস্যদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোরবানির পশুর চামড়া যথাযথ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে নিয়োজিত করা গেলে চামড়া শিল্পের প্রসারে বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে আরোও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.