× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

বরাদ্দের ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, তবুও নেই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ক্ষোভ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি।

২০ মে ২০২৬, ২০:১৯ পিএম

২০১২ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বাধ্যতামূলক করা হলেও দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যাপ্ত আইসিটি শিক্ষক ও আধুনিক শিক্ষা উপকরণের সংকট রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) প্রকাশিত ২০২৩ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০ হাজার ৩৫৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৪ হাজার ৭১২ জন। প্রায় ২৮ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজনও আইসিটি শিক্ষক নেই। গড়ে ৬৮৯ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন আইসিটি শিক্ষক।

এই বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও শিক্ষা উপকরণে বরাদ্দ দিলেও রামকলা শাইলবাড়ি এসআর উচ্চ বিদ্যালয়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।

রোববার (১৭ মে) ও বুধবার (২০মে) সরেজমিনে বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, আইসিটি বিষয়ে পাঠদান চললেও শিক্ষার্থীরা এখনো প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। শ্রেণিকক্ষে নেই কোনো মাল্টিমিডিয়া ব্যবস্থা। পুরোনো পদ্ধতির পাঠদানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ অর্থবছরে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সংস্কার ও শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ের জন্য বিদ্যালয়টি মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। এর মধ্যে কম্পিউটার বাবদ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, টিভি/মনিটর বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, ইউপিএস ৭ হাজার ৫০০ টাকা, পেনড্রাইভ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং রাউটার বাবদ ৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। তবে বাস্তবে বিদ্যালয়ে গিয়ে এসব উপকরণের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষক রেবা বেগম বলেন, “আমি ২০০১ সালে এই বিদ্যালয়ে যোগদান করি এবং ২০০৫ সালে এমপিওভুক্ত হই। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের ডিজিটাল উপকরণ ছাড়াই আইসিটি ক্লাস নিতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই। গত বছর মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও উপকরণের জন্য বরাদ্দ এলেও কিছুই কেনা হয়নি।”

সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বর্তমান যুগে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক।”

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলে,“আমরা বইয়ে কম্পিউটারের অনেক কিছু পড়ি, কিন্তু বাস্তবে দেখার সুযোগ পাই না। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস থাকলে পড়াশোনা আরও সহজ হতো।”

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম জানায়, “অন্যান্য স্কুলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস হয় শুনেছি। কিন্তু আমাদের স্কুলে এখনো বোর্ড আর বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়।”

স্থানীয় অভিভাবক আব্দুস সালাম বলেন, “সরকার শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষার জন্য টাকা দিচ্ছে, কিন্তু সেই সুবিধা যদি শিক্ষার্থীরা না পায় তাহলে দায় কার? তদন্ত করে সত্য বের করা দরকার।”

স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক শাহিনা বেগম বলেন, “গ্রামের অনেক গরিব পরিবারের ছেলে-মেয়েরা এই স্কুলে পড়ে। তারা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। বরাদ্দের টাকা কোথায় গেল সেটি প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত।”

মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক বিপেন চন্দ্র রায় ও আবুল কালাম আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার আওতায় আনতে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়ে সেই বরাদ্দের বাস্তব কোনো প্রতিফলন নেই। মাল্টিমিডিয়া উপকরণ ক্রয়ের জন্য গঠিত কমিটিতে আমাদের থাকার কথা থাকলেও প্রধান শিক্ষক হিমাংসু কুমার বর্মণ এ বিষয়ে আমাদের কোনো সভা, সিদ্ধান্ত বা ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেননি। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত আমরা কোনো প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, সাউন্ড সিস্টেম কিংবা মাল্টিমিডিয়া উপকরণ বিদ্যালয়ে ব্যবহার হতে দেখিনি।”

তারা আরও বলেন, “বিষয়টি জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বারবার বলেন, ‘সম্রাট মাল্টিমিডিয়ায় রাখা আছে, পরে নিয়ে আসা হবে।’ কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো উপকরণ বিদ্যালয়ে আনা হয়নি। বাস্তবে কোনো উপকরণ ক্রয় না করেই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে আমাদের দৃঢ় সন্দেহ। এর ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তথ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।”

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিমাংশু কুমার বর্মণ দাবি করেন, উপকরণ ক্রয় করা হয়েছে। তবে সেগুলো মেরামতের জন্য সদরের উকিলের মোড় এলাকার ‘সম্রাট মাল্টিমিডিয়া’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে। যদিও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু না থাকার বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তিনি দ্রুত উপকরণ বিদ্যালয়ে এনে ক্লাস চালুর আশ্বাস দেন।

নীলফামারী সদর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. গাজীউর রহমান বলেন, “২০২৪ সালে বিদ্যালয়ের জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরিদর্শনে গিয়ে কোনো মাল্টিমিডিয়া উপকরণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি বারবার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ও সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ, বারবার নির্দেশনার পরও তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।”

নীলফামারী সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ.টি.এম.  নূরল আমীন শাহ বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে বিদ্যালয়ে বরাদ্দের অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.