ছবির ক্যাপশন: বনের কাঠ ব্যবহার করে চলছে ইটভাটা।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সংরক্ষিত চুনতি ও পদুয়া বন এখন যেন কাঠ পাচারকারীদের অভয়ারণ্য। দিনের আলো ফুরালেই বন কেটে ট্রাকভর্তি কাঠ যাচ্ছে ইটভাটায়, আর সেই কাঠের আগুনে প্রতিদিন জ্বলছে শত শত চুল্লি। অভিযোগ উঠেছে, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠেছে কোটি টাকার কাঠ পাচার সিন্ডিকেট। বন বিভাগকে ‘ম্যানেজ’ করেই বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে চলছে বন উজাড়, কাঠ পাচার ও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর মহোৎসব। এতে শুধু বন ধ্বংসই নয়, হুমকির মুখে পড়েছে চুনতি বনের হাতিসহ বিরল বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য।
গত কয়েকদিনে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও চকরিয়া এলাকার বিভিন্ন ইটভাটা, বনাঞ্চল এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংরক্ষিত বন থেকে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক কাঠ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। এসব কাঠের বড় অংশই আসে চুনতি ও পদুয়া বনাঞ্চল থেকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইটভাটার চারপাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ কাঠ। শ্রমিকদের তথ্যমতে, প্রতিটি ভাটায় প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ টন কাঠ পোড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতি টন কয়লার দাম ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা হলেও মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে কাঠ। ফলে অধিক মুনাফার আশায় কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার করছেন ভাটা মালিকরা।
স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা, কাঠ ব্যবসায়ী ও ইটভাটা মালিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই বন কেটে কাঠ সরবরাহ, পরিবহন এবং প্রশাসনিক ‘ম্যানেজ’ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইটভাটা ম্যানেজার বলেন, “সিজন শুরু হলে থানা, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে হয়। সমিতির মাধ্যমেই সব লেনদেন হয়। টাকা না দিলে ব্যবসা করা কঠিন।”
অভিযোগ রয়েছে, পদুয়া ফরেস্ট চেকস্টেশন এখন কার্যত ঘুষ বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কাঠবোঝাই ট্রাক থেকে এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেনের পাশাপাশি মাসিক ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার দুর্নীতির অর্থ ভাগবাটোয়ারা হয় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
গত ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা এক অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন কাঠ চোরাকারবারি ও ইটভাটা মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বনাঞ্চলের কাঠ পাচারে সহায়তা করছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মৌসুমভিত্তিক প্রায় ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে পুরো কাঠ পাচার কার্যক্রম ‘ম্যানেজ’ করা হয় এবং চুনতি রেঞ্জ অফিসের মাধ্যমে তা সমন্বয় করা হয়। এর ফলে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক অবৈধ কাঠ বিভিন্ন ইটভাটায় প্রবেশ করছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৪০২টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত করাতকলের সংখ্যা প্রায় ২২০টি। বাকিগুলো বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব করাতকলেই মূলত বন থেকে কেটে আনা কাঠ প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, চুনতি বন শুধু একটি বনাঞ্চল নয়, এটি হাতির গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র। নিয়মিত হাতি চলাচল করে এ বনে। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। বন উজাড় অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মানুষ-হাতি সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
এছাড়া বন বিভাগের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের জায়গায় স্থাপনা বা মাছের ঘের থাকলে মামলা ও উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। টাকা না দিলে হয়রানি ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর লোহাগাড়ার চুনতি জাঙ্গালিয়া বড় ডেপাঘোনা এলাকায় বন বিভাগের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। সেখানে অভিযোগ করা হয়, ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি পূরণ না হওয়ায় বন বিভাগের লোকজন বহিরাগতদের নিয়ে অন্তত ৯টি মাছের ঘেরের পাড় কেটে দেয় এবং প্রায় এক হাজার ফলদ গাছের চারা নষ্ট করে। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ দিচ্ছে। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি।”
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের উপবন সংরক্ষক মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, “কোথায় বনের কাঠ যাচ্ছে, সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দুদক চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক রিজিয়া খাতুন বলেন, অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আক্তার কবির চৌধুরী বলেন, “আইন অনুযায়ী ইটভাটায় কাঠ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু যারা বন রক্ষার দায়িত্বে, তারাই যদি এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে বন ও পরিবেশ রক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নীতিমালা অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন এবং জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ দক্ষিণ চট্টগ্রামের অধিকাংশ ইটভাটাই গড়ে উঠেছে বনাঞ্চল ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকায়। ফলে বন ধ্বংস, পাহাড় কাটা এবং পরিবেশ বিপর্যয় দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
