মৌলভীবাজারের বড়লেখায় শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য নিয়ে সাময়িক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তবে পরদিন অন্য প্রতিষ্ঠানে পুনরায় পরীক্ষা করালে মা ও গর্ভস্থ শিশুর অবস্থা স্বাভাবিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।এদিকে এ ঘটনায় শুক্রবার শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার না চালানোর অনুরোধ জানিয়েছে। ভুক্তভোগী ওই অন্তঃসত্ত্বা রোগীর নাম সামিরা বেগম (২৩)। তিনি বড়লেখা উপজেলার মুছেগুল গ্রামের এমদাদুল ইসলাম শাফির স্ত্রী।
ভুক্তভোগী নারীর স্বামী এমাদুল ইসলাম শাফি জানান, গত ১৪ এপ্রিল শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আমার স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করি। ডা. অন্তরা রায় পূজা স্বাক্ষরিত ওই রিপোর্টে ‘সিঙ্গেল লাইভ প্রেগন্যান্সি’ এবং বাচ্চার হার্টবিট ১৪৩ বিপিএম উল্লেখ থাকলেও, একইসঙ্গে ফিটাল মুভমেন্ট অ্যাবসেন্ট ও কার্ডিয়াক পালসেশন অ্যাবসেন্ট লেখা ছিল। পরে ওই রিপোর্টটি দেখাতে আমি ডা. প্রিয়াংকা ভট্টাচার্যের চেম্বারে যাই। পরে উনাকে না পেয়ে রিপোর্টটি উনার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাই। সেটি দেখে তিনি আমার বাচ্চাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর আমি উনাকে আবার আল্ট্রাসনোগ্রাম করব কিনা জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু তিনি এতে সায় দেননি। বরং তিনি আমাকে বড়লেখা পলি ক্লিনিকে গিয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য বলেন এবং ডা. তানভীরের সঙ্গে কথা বলে ইনজেকশনের মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারি করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ক্লিনিকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে দেবেন এবং সেখানে ২ থেকে ৩ দিন থাকতে হতে পারে। এছাড়া তিনি জানান, যদি টাকা-পয়সার সমস্যা হয় বা ডা. তানভীর ডেলিভারি করতে রাজি না হন, তাহলে সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে গিয়ে ডেলিভারি করার জন্য। অন্যথায় রোগীর বড় ক্ষতি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন। এই কথা শুনে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যাই। আমরা সারারাত মানসিক চাপের মধ্যে ছিলাম এবং পরিবারের সবাই কান্নাকাটি করে অস্থির হয়ে পড়েন। পরের দিন আমরা সিলেটের মা ও শিশু হাসপাতালে পুনরায় আমার স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করি। সেখানে বাচ্চার মুভমেন্ট ও হার্টবিট (১৩৬ বিপিএম) স্বাভাবিক পাওয়া যায়। গর্ভকাল প্রায় ২৯ সপ্তাহ নির্ধারণ করা হয় এবং বাচ্চার আনুমানিক ওজন ধরা হয় ১ হাজার ৩৩৮ গ্রাম। পাশাপাশি বাচ্চার অবস্থান ‘সেফালিক’ (মাথা নিচের দিকে), প্লাসেন্টা ‘অ্যান্টেরিয়র’ এবং গর্ভের পানির পরিমাণও স্বাভাবিক রয়েছে। এতে আমাদের মধ্যে স্বস্তি আসে।
এদিকে এই ঘটনায় শুক্রবার শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ ভুল রিপোর্ট দেওয়ার কারণ উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছে। লিখিত ব্যাখ্যায় কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে, গত ১৪ এপ্রিল আমাদের সেন্টারে সম্পাদিত একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে রোগীর নাম সামিরা, বয়স: ২২ বছর, আইডি: ৫৬৬৯-এ একটি অনিচ্ছাকৃত টাইপিং ভুল পরিলক্ষিত হয়েছে। উক্ত রিপোর্টে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. অন্তরা রায় পূজা তাঁর পর্যবেক্ষণে (কামেন্ট সেকশন) স্পষ্টভাবে ‘সিঙ্গেল লাইভ প্রেগন্যান্সি’ এবং ভ্রূণের হৃদস্পন্দন ‘এফএইচএস: ১৪৩ বিপিএম’ উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমাদের ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের অসাবধানতা এবং সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে কার্ডিয়াক পালসেশন-এর কলামে ‘প্রেজেন্ট’-এর পরিবর্তে ‘অ্যাবসেন্ট’ শব্দটি মুদ্রিত হয়। চিকিৎসক হিসেবে ডা. অন্তরা রায় পূজা প্রদত্ত মূল ডায়াগনোসিস (ভ্রূণের বয়স এবং জীবিত থাকা) সম্পূর্ণ নির্ভুল ছিল, যা পরবর্তীকালে সিলেটে অন্য ল্যাবরেটরির রিপোর্টেও সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। একটি যান্ত্রিক ভুলকে কেন্দ্র করে দক্ষ ও সম্মানিত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপপ্রচার না করার জন্য সকলকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে এই ধরনের ভুল যাতে না ঘটে, তার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি এবং তা যথাযথভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করছি।
এ বিষয়ে ডা. অন্তরা রায় পূজা জানান, আমার স্বাক্ষরিত রিপোর্টে হার্টরেট ১৪৩ বিপিএম ও লাইভ প্রেগন্যান্সি মানে জীবিত ভ্রুণ উল্লেখ থাকলেও টাইপের সময় ভুলবশত ফিটাল মুভমেন্ট কার্ডিয়াক পালসেশন অ্যাবসেন্ট লেখা ছিল। এটি আমার এসিস্ট্যান্ট কম্পিউটারে লেখার সময় টাইপিং মিসটেক করে। তবে রিপোর্টের নিচে কমেন্টে ‘সিঙ্গেল লাইভ প্রেগন্যান্সি’ উল্লেখ ছিল। রোগী পরবর্তীতে যে চিকিৎসককে দেখিয়েছেন, তিনি আমার রিপোর্টটি ভালোভাবে হয়তো দেখেননি। রিপোর্টের কমেন্ট দেখলে তিনি হয়তো বুঝতে পারতেন। অথবা পুনরায় ওই আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়ে নিতে বলতেন, তাহলে রোগী বা তার স্বজনরা স্বস্তি পেতেন।
অন্যদিকে ডা. প্রিয়াংকা ভট্টাচার্য বলেন, পেশেন্টের স্বামী তাকে বলেছিলেন এক সপ্তাহ থেকে বাচ্চার নড়াচড়া কম পাওয়া যাচ্ছে। তখন আমি নিজেই নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। আর তারা আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট তাকে সরাসরি দেখাননি, সেটি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিলেন। সেটা দেখে তিনি গাবড়ে যান। তখন তাদের (পেশেন্টের স্বামী) বলছিলেন যে আপনারা সিলেটে ভালো কোনো হাসপাতালে যান। তখন তারা বললো তাদের একটু সমস্যা। তখন আমি বলেছি আমি যেখান কাজ করি সেখানে আসেন। তবে রিপোটর্টা আমার ভালোভাবে দেখে উচিত ছিল এবং তাদের আবার আলট্রা করার কথাও বলা উচিত ছিল। তবে সরাসরি রিপোর্ট দেখলে হয়তো বুঝতে পারতাম। তখন এই সমস্যা হত না। তবে পরবর্তীতে পেশেন্টের গর্ভে থাকা বাচ্চা সুস্থ থাকায় তিনি শুনে খুশি হয়েছেন এবং রোগীর স্বামীর সাথে কথা বলেছেন।
বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসক জানান, তিনি উভয় রিপোর্ট পর্যালোচনা করেছেন। প্রথম রিপোর্টে ‘সিঙ্গেল লাইভ প্রেগন্যান্সি’ এবং বাচ্চার হার্টবিট ১৪৩ বিপিএম উল্লেখ থাকলেও একই সঙ্গে ফিটাল মুভমেন্ট অ্যাবসেন্ট এবং কার্ডিয়াক পালসেশন অ্যাবসেন্ট লেখা ছিল। যা মূলত টাইপিং মিসটেক বলে শুনেছেন। তিনি বলেন, রিপোর্ট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, যে চিকিৎসক রোগীর রিপোর্টটি দেখেছিলেন, তিনি যদি আরও গভীরভাবে যাচাই করতেন অথবা পুনরায় পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতেন, তাহলে রোগী বিভ্রান্ত হতেন না। আর আতঙ্কিত না হয়ে মানসিকভাবে স্বস্তি পেতেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
