ছবি: শমশেরনগর চা বাগানে ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর চা বাগানে অবস্থিত ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতালটি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর চার দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে ডানকান ব্রাদার্সের মালিকানাধীন ১৫টি চা বাগানের লক্ষাধিক শ্রমিক, তাদের পরিবার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন।
ইংল্যান্ডভিত্তিক ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এ হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত এই হাসপাতালটিতে শুধু চা শ্রমিকরাই নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষও জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতেন।
গত ২৭ মার্চ শুক্রবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ঐশি রবিদাস (১৩)-এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অভিযোগ ওঠে, ভুল চিকিৎসার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ দল হাসপাতালে ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং চিকিৎসকদের ওপর হামলা করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে মাথাব্যথা নিয়ে ঐশি রবিদাস হাসপাতালে ভর্তি হয়। রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন। তবে রোগীর স্বজনরা তখন স্থানান্তরে সম্মত হননি। পরদিন সকালে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এ ঘটনার পর চা বাগানের এক নেতার নেতৃত্বে উত্তেজিত জনতা হাসপাতালে হামলা চালায়। তারা হাসপাতালের পরিচালক ডা. আনোয়ার হোসেনকে লাঞ্ছিত করে এবং অন্যান্য চিকিৎসকদের মারধর করে। এসময় হাসপাতালের বিভিন্ন সরঞ্জামও ভাঙচুর করা হয়।
খবর পেয়ে শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হাসপাতালের পরিচালককে উদ্ধার করে। তবে নিরাপত্তাহীনতার কারণে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই হাসপাতালের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ফলে শনিবার থেকে সাধারণ চা শ্রমিকরা চিকিৎসাসেবা নিতে পারছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নারী চা শ্রমিক জানান, ‘ক্যামেলিয়া হাসপাতালই ছিল তাদের প্রধান ভরসা। অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে সমাধান করা যেত, কিন্তু হামলা ও ভাঙচুরের কারণে এখন সবাই ভোগান্তিতে পড়েছেন।’
নিহত শিশুর স্বজনদের দাবি, ‘চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই ঐশির মৃত্যু হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া উচিত ছিল।’
এদিকে রোববার শমশেরনগর চা বাগানে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখনো হাসপাতাল চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত তদন্ত শেষ করে হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় চালু না হলে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।
মুঠোফোনে আলাপকালে চা শ্রমিক ওই নেতা বলেন, ‘তিনি এ উত্তেজনার সৃষ্টি করেননি। তিনি উপস্থিত না থাকলে পরিচালক ডাক্তার আনোয়ারকে নিরাপদে বের করা যেত না। তিনি উত্তেজনা নিরসনের চেষ্টা করেছেন। রাতে আবার ফেইসবুকে সরাসরি ভিডিও বক্তব্য সম্পর্কে মোহন রবিদাস বলেন, ‘আসলে এ মুহুর্তে তার এ ভিডিও বক্তব্য দেওয়া ঠিক হয়নি।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা রামভজন কৈরী বলেন, ‘ঐশির মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তবে এ ধরনের সহিংসতা কাম্য নয়। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত।’ তিনি আরও জানান, হাসপাতালের সেবা পুনরায় চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
শমশেরনগর চা বাগানের ব্যবস্থাপক ও ডানকান ব্রাদার্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘হাসপাতালটি একটি স্বতন্ত্র ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত হয়। পুরো বিষয়টি ইংল্যান্ডে অবস্থিত ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন পর্যবেক্ষণ করছে। তারা শিশুটির মৃত্যুর কারণ, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং হামলার ঘটনাও পৃথকভাবে তদন্ত করবে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকদের ফিরে আসা কঠিন। তাই হাসপাতাল চালু হওয়া এখন সম্পূর্ণভাবে ফাউন্ডেশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
