ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও অন্যান্য তিন চাকার যান। কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে এসব যান অবাধে চলাচল করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করেই মহাসড়কে নামছে এসব যানবাহন। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ব্যাহত হচ্ছে দ্রুতগতির যান চলাচল।
গত এক সপ্তাহ সরেজমিনে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে লোহাগাড়া পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রকাশ্যেই চলছে তিন চাকার যান। অনেক ক্ষেত্রে হাইওয়ে থানার সামনেও তাদের চলাচল চোখে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
এদিকে ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কে সিএনজি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সব ধরনের থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্যে রয়েছে এন-ওয়ান সড়ক, যা কাঁচপুর সেতু থেকে চট্টগ্রাম হয়ে রামু পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ মিরসরাই থেকে চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার অংশও এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, নিষেধাজ্ঞা জারির পর প্রথম দিকে মহাসড়কে শৃঙ্খলা কিছুটা ফিরেছিল। দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কার নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারত। দুর্ঘটনার সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কমে আসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নজরদারি শিথিল হয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর আবারও বাড়তে থাকে তিন চাকার যানের উপস্থিতি।
ঢাকা–চট্টগ্রাম অংশে বিশেষ করে সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই এলাকায় আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত মিডিয়ান গ্যাপ না থাকা। তিন থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত কোথাও ইউ-টার্ন বা বৈধ পারাপারের ব্যবস্থা নেই। ফলে স্থানীয় অনেক চালক উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছান। এই পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছে বলে অভিযোগ।
অনেক চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই, নেই রেজিস্ট্রেশন নম্বরও। যাত্রী বোঝাই অবস্থায় তারা হঠাৎ সড়কের মাঝখানে থেমে যাওয়া, সংকেত ছাড়া মোড় নেওয়া কিংবা বিপজ্জনক ইউ-টার্ন করার মতো কাজ করছেন। এতে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবসময় থেকেই যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এসব যান চলাচল করছে। আগে নাকি মাসিক টোকেন কাগজ আকারে দেওয়া হতো। এখন মুঠোফোনে লেনদেনের মাধ্যমেই অনুমতি মেলে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালক জানান, বিভিন্ন সমিতির মাধ্যমে মাসিক টাকা দিতে হয়। কেউ কেউ দাবি করেন, নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে গাড়ি আটকালেও ছেড়ে দেওয়া হয়।
পটিয়া এলাকায় নাজিম নামে এক চালক বলেন, সিগন্যাল দিলে তিনি পরিচিত এক কর্মকর্তাকে ফোন করেন, পরে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। লোহাগাড়ার এক রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি চালক জানান, নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচলের জন্য মাসিক চুক্তি রয়েছে। শহরে ঢুকতে চাইলে আবার আলাদা সমঝোতা করতে হয়।
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটের বাসচালক মানিক মিয়া বলেন, তিন চাকার যান মহাসড়কে বড় ঝামেলা। তারা হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়, সংকেত ছাড়াই দিক পরিবর্তন করে। এতে দুর্ঘটনার দায় শেষ পর্যন্ত বাসচালকদের ওপরই পড়ে।
যাত্রীরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। মো. রুহুল আমিন নামের এক যাত্রী বলেন, তিন চাকার যান মূলত অভ্যন্তরীণ সড়কের জন্য উপযোগী। মহাসড়কে এদের উপস্থিতি মানেই ঝুঁকি। তিনি মনে করেন, পর্যাপ্ত লোকাল বাসের ব্যবস্থা থাকলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে এসব ছোট যান ব্যবহার করতেন না।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভিন্ন কথা বলছেন। পটিয়ার ট্রাফিক পরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, তিনি মূলত পৌরসভা পয়েন্ট এলাকার দায়িত্বে আছেন, মহাসড়ক হাইওয়ে পুলিশের আওতায়। সাতকানিয়ার টিআই নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, নিয়মিত মামলা ও জব্দ কার্যক্রম চলছে। লোহাগাড়ার টিআই মো. হাসানুজ্জামান হায়দার বলেন, অবৈধ গাড়িকে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ। প্রতিদিনই অভিযান চলছে। আমরা স্থায়ী জনপ্রতিনিধি শ্রমিক নেতাদের সহযোগিতায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে এক্ষেত্রে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পটিয়া হাইওয়ে থানার ওসি হারুনুর রশিদও একই দাবি করেন।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কীর্তিমান চাকমা বলেন, ব্যাটারি রিকশা, প্যাডেল রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও ভ্যানগাড়িসহ সব তিন চাকার যান মহাসড়কে নিষিদ্ধ। নিয়মিত অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।
নিরাপদ সড়ক চাই চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি এস. এম আবু তৈয়ব বলেন, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি প্রস্তাব দেন, মহাসড়কের পাশে আলাদা সার্ভিস লেন বা ছোট সড়ক তৈরি করা হলে স্থানীয়দের প্রয়োজনও মেটানো যাবে, আবার মূল সড়কও নিরাপদ থাকবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, মহাসড়কের অধিকাংশ দুর্ঘটনার দায় বাসচালকদের ঘাড়ে চাপানো হয়, অথচ অবৈধ তিন চাকার যান বড় কারণ। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বিকল্প ব্যবস্থা। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত গণপরিবহন, সার্ভিস লেন নির্মাণ, কঠোর লাইসেন্স যাচাই এবং ডিজিটাল নজরদারি একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে টোকেন বাণিজ্যের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
