ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় প্রায় হাফডজন ব্যক্তি অনুমোদিত সনদ ছাড়াই দাঁতের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনুমোদিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কোনো সনদ না নিয়েই নিজেদের ইচ্ছামতো নামের আগে ও পরে বড় বড় ডিগ্রি ব্যবহার করে দাঁতের চিকিৎসালয় খুলে বসেছেন তারা।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) স্বীকৃত সার্জন কিংবা ডিটি ডিপ্লোমা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট না হয়েও নামের আগে-পরে ডাক্তার, ডেন্টিস্ট, ডিডিটি, বিডিএ, ডিটি, এলএমএফসহ নানা চটকদার বিশেষণ লিখে রোগী বাগিয়ে নিতে ব্যস্ত এসব নামধারী চিকিৎসকরা। প্রকাশ্যে চেম্বার খুলে দিনের পর দিন তারা কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও জেলা বা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কোনো তদারকি চোখে পড়েনি।
জীবননগর উপজেলায় ডেন্টাল সার্জন (BDS) আছেন দুইজন ডা. তৌহিদুজ্জামান (তৌহিদ), ডা. জান্নাতুল নাহিদ (মিতু)।
মাহামুদা ডেন্টাল চেম্বারের ইয়াছিন আরাফাত, জীবননগর ডেন্টাল কেয়ারের সাজিদুর রহমান (রাশেদ), এবং আল-মদিনা ডেন্টাল চেম্বারের নাইম হোসেন (হৃদয়)। ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট ডিগ্রি নিয়ে প্র্যাকটিস করছেন। উল্লিখিত, ৩ বৎসর (বর্তমানে ৪ বৎসর) মেয়াদী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) সনদধারীগণ প্র্যাকটিস করতে পারবেন। (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরর পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মনজুর আহমেদ এর স্বাক্ষরিত (৬/৭/২০১৭)স্মারক নং- স্বাঃ অধিঃ/হাসঃ/চাঃ ও সরঃ/বিবিধ-১/চট্টঃ বিঃ/২০১৫/১১১২)
চাঁদের হাসি ডেন্টাল জোনে রোগী দেখছেন বিদিশা সুলতানা তিনি নামের আগে ডেন্টিস ও পরে ডি.ডি.টি লাগিয়ে করছেন প্র্যাকটিস। এই ডিগ্রি নিয়ে তিনি প্র্যাকটিস করতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে তনি বলেন যশোর থেকে ডা. মেসবাহ-উর-রহমান মেডিকেল টেকনোলজী কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছি আমরা শুধু প্রথমিক চিকিৎসা দিতে পারব এবং অন্যরা চেম্বার করতে পারলে আমিও পারব।
জীবননগর পৌর শহরের ঢাকা ডেন্টাল, নিরাময় ডেন্টাল হোম, নিউ ডেন্টাল হোম, যিয়াদ ডেন্টাল, বিল্লাল ডেন্টাল কেয়ারের দাবি তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ছয় মাস ও এক বছরের কোর্স করে চেম্বার খুলে রোগী দেখেছেন।
সরেজমিন এসব চিকিৎসালয় ঘুরে দেখা যায়, দাঁতের ফিলিং, স্কেলিং, লাইট কিউর, দাঁতের সার্জারি, ফিলিং ক্যাপ, দাঁত ওঠানো, দাঁত বাঁধানোর সব কাজই করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন অনুযায়ী এসব ডাক্তারগণ কেউই অনুমোদিত ডিগ্রিধারী নন।
জীবননগরের ঢাকা ডেন্টালে রফিকুল আলম নামে পরে ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল টেকনোলজি ডিগ্রি নিয়ে দন্ত চিকিৎসক পরিচয়ে প্র্যাকটিস করছেন। এই ডিগ্রি নিয়ে চেম্বার খুলে প্র্যাকটিস করা যায় কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন আমি যশোর থেকে কোর্স করেছি। আর এভাবেই চলছে, আমাদের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।
উপজেলার নিরাময় ডেন্টাল হোমের পরিচালক হাবিবুর রহমান এর নামের পরে দাঁত লাগানো পুটিং ও ওয়াস করা হয় টাইটেল লাগিয়ে চেম্বার খুলে বসেছেন। এ বিষয়ে কোনো অনুমতি আছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোটচাঁদপুর ডিপ্লোমা কলেজ থেকে কোর্স করেছি, আমরা গ্রাম্য ডাক্তার। ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তারপর চেম্বার খুলেছি। (আমাদের অনুসন্ধানে কোটচঁদপুরে কোন ডেন্টাল ডিপ্লোমা কলেজ পাওয়া যায়নি)
নিউ ডেন্টাল হোমে দাঁত তোলা, ফুল সেট দাঁত বাঁধানোসহ অন্য রোগের চিকিৎসা করেন আব্দুল জব্বার। প্রতি বুধবারে বিডিএস ডাক্তার রাগী দেখেন, অন্য দিনে আব্দুল জব্বার রোগী দেখেন। আব্দুল জব্বার রোগী দেখতে পারবেন কী না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন আমরা কোর্স করেছি, এভাবে চলছে চিকিৎসা, তিনি এই কোর্সের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে পারবেন কী না প্রশ্নের জবাবে বলেন আমার জানা নেই যদি স্বাস্থ্যবিভাগ চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বলে তাহলে আমরা চিকিৎসা বন্ধ করে দিব।
যিয়াদ ডেন্টালে মো. মোস্তাফিজুর আনোয়ার (ওয়ালিদ) নামের পরে ডিডিটি (বগুড়া), আর.এম.পি (ঢাকা) ডিগ্রি লাগিয়ে দেখছেন রোগী, উল্লিখিত ডিগ্রি নিয়ে রোগী দেখতে পারবেন কিনা? এ বিষয়ে বলেন বগুড়া থেকে ২০২৪ সালে ডিপ্লোমা কোর্স করেছি , তার কত বছর প্র্যাকটিসের বয়স জানতে চাইলে উত্তরে বলেন ডেন্টাল জগতে ১৭ থেকে ১৮ বছর প্র্যাকটিসের বয়স। পরিশেষে তার ডিগ্রি নেই স্বীকার করে দবি করেন জীবননগরে যত ডেন্টাল চিকিৎসালয় আছে তার মধ্যে রফিকুল আলম, হাবিবুর রহমান, আব্দুল জব্বার, বিল্লাহ হোসেনরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে তাদের ডিগ্রি আছে।
এছাড়া জীবননগর শহরের বিল্লাল ডেন্টাল কেয়ার রোগী দেখেন বিল্লাহ হোসেন নামের পরে বি.ডি.এ (ঢাকা) ডিগ্রি দিয়ে দাঁতের সকল চিকিৎসা করেন। বিল্লাহ হোসেন দাবি করেন তার চেম্বারে ডিডিএস ডাক্তার দিয়ে রোগী সেবা করা হয়, সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় বিল্লাহ হোসেন রোগী দেখছেন। রোগী দেখতে পারবে কী না প্রশ্নে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
জীবননগর পৌর শহরের মর্ডান ডেন্টাল এর ডেন্টাল সার্জন ডা. তৌহিদুজ্জামান (তৌহিদ) বলেন, জীবননগরে কেবল দুইজন বিডিএস এবং কয় একজন ডি.টি আছেন। আরও অনেক গুলো ডেন্টাল চেম্বার আছে এ বিষয়ের যদি জেলা বা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকি বাড়ালে এগুলো ধরা পড়বে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মকবুল হাসান বলেন, জীবননগরে ডেন্টাল সার্জন বা ডেন্টাল টেকনোলজি ডিগ্রিধারী নেই বললেই চলে। আর যারা বিডিএসের বাইরে তার হলেন কোয়াক বা হাতুড়ে। আমরা এ বিষয়ে সতর্ক আছি। প্রয়োজনে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা( ইউএনও) মো. আল-আমীন হোসেন বলেন ডেন্টালের বিষয় আপনাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম। এ বিষয়ে আমরা স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে আলোচনা করে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিডিএস ছাড়া কেউ নামের আগে চিকিৎসক-ডাক্তার পদবি এবং ডিগ্রি ছাড়া প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। কেউ যদি ডিগ্রি ছাড়া অবৈধভাবে চেম্বার খুলে প্র্যাকটিস করে থাকেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদন ছাড়া কেউ নামের আগে বা পরে ডাক্তার বা উচ্চতর ডিগ্রি বিষয়ে কোনোও কিছুই ব্যবহার করতে পারবেন না বলে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। এছাড়া নিবন্ধিত চিকিৎসক বা দন্ত চিকিৎসকদের তাদের সাইনবোর্ডে, প্রেসক্রিপশন প্যাড বা ভিজিটিং কার্ড ইত্যাদিতে পিজিটি, বিএইচএস, এফসিপিএস (পার্ট-১ ও পার্ট-২ ), এমডি (ইন কোর্স), (পার্ট-১), (পার্ট-২), (থিসিস পর্ব), (শেষ পর্ব), কোর্স কমপ্লিটেড (সিসি), এমএস (ইন কোর্স) ইত্যাদি এবং দেশবিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া ফেলোশিপ এবং প্রশিক্ষণ, যেমন এফআরসিপি, এফআরএইচএস, এফআইসিএ, এফআইসিএস, এফএএমএস, এফআইএজিপি ইত্যাদি উল্লেখ না করার জন্য নির্দেশ দেন আদালত। কারণ, এগুলো বিএমডিসি স্বীকৃত নয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনের ২৯(১) ধারার ভাষ্য, এই আইনের অধীন নিবন্ধন করা কোনো মেডিকেল চিকিৎসক বা ডেন্টাল চিকিৎসক এমন কোনো নাম, পদবি, বিবরণ বা প্রতীক এমনভাবে ব্যবহার বা প্রকাশ করবেন না, যার ফলে তার কোনো অতিরিক্ত পেশাগত যোগ্যতা আছে বলে কেউ মনে করতে পারে, যদি না তা কোনো স্বীকৃত মেডিকেল চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতা বা স্বীকৃত ডেন্টাল চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতা হয়ে থাকে।
ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিপ্রাপ্তরা ব্যতীত অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। ২৯ (২) ধারার ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করলে তা হবে একটি অপরাধ এবং সেজন্য তিনি ৩ (তিন) বছর কারাদণ্ড বা ১ (এক) লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং ওই অপরাধ অব্যাহত থাকলে প্রতিবার এর পুনরাবৃত্তির জন্য অন্যূন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে, বর্ণিত দণ্ডের অতিরিক্ত হিসাবে, দণ্ডনীয় হবেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2025 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh