ঈদুল ফিতরের টানা ৯ দিনের টানা ছুটিতে মৌলভীবাজার জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে রীতিমতো ঢল নেমেছে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকের। সবচেয়ে বেশি পর্যটক এসেছে সবুজ বন, উঁচুনিচু পাহার-টিলা আর চাবাগান ঘেরা কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও ন্যাশনাল টি কোম্পানীর মালিকানাধীন পদ্ম আর শাপলা সমৃদ্ধ মনোরম প্রকৃতির মাধবপুর লেকে।
এছাড়াও ব্যাপক সংখ্যক পর্যটক আগমন ঘটে শ্রীমঙ্গলের বধ্যভুমি-৭১ ও সারি সারি চাবাগান আর সড়কের পাশে অবস্থিত সাদা সোনা খ্যাত অসংখ্য রাবার বাগান সহ বিটিআরআই এলাকার পর্যটন স্পটগুলোতে। এসব স্পটে ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট সহ সারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঈদ ভ্রমণে ছুটি কাটাতে পর্যটকরা এসেছেন। ঘুরতে আসা পর্যটকরা ঈদের আগেই কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের পাঁচতারকা মানের হোটেল, রিসোর্ট ও গেষ্ট হাউজে রুম বুকিং সম্পন্ন করেন। যার কারণে পর্যটন এলাকা গুলোতে অবস্থিত হোটেল-রিসোর্টে খালি নেই কোন রুম। এছাড়াও পর্যটন এলাকাগুলোর প্রতিটি সড়কে দেখা গেছে পর্যটকবাহী যানবাহনের ব্যাপক চাপ। তবে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সবগুলো পর্যটন স্পটে পর্যটকের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও বৃহত্তম হাইল হাওরে অবস্থিত মিঠা পানির জলাশয় ও হাজারও অথিতি পাখির নিরাপদ ঠিকানা বাইক্কা বিলে নেই কোন পর্যটক। সম্প্রতি সরকারি নির্দেশনায় বিলটিতে পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় সেখানে কোন পর্যটক প্রবেশ করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন অভয়াশ্রমের ব্যবস্থাপনার দ্বায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ঈদের চতুর্থ দিনে গিয়েও দেখা যায় দলবেঁধে উদ্যানের ভিতরে প্রবেশ করছেন পর্যটকরা। এর বাহিরে উদ্যানের টিকিট কাউন্টার ও মূল সড়কেও পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। পর্যটকের এমন চাপে রীতিমতো গেটের নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে থাকা সদস্যদের হিমশিম খেতেও দেখা যায়।
জানা যায়, ঈদ ভ্রমনে পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘুরতে জেলার বড়লেখা উপজেলার মাধবকুÐ জলপ্রপাত, বৃহত্তম মিঠাপানির হাওর হাকালুকি, কমলগঞ্জের সীমান্ত এলাকার হামহাম জলপ্রপাত, রাজনগরের কমলা রাণীর দিঘি, শ্রীমঙ্গলের সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, মৌলভীবাজার শহরের মনুনদীর তীরবর্তী দৃষ্টিনন্দন পৌর ওয়াকওয়ে, মনুব্যারেজ সহ জেলার সবগুলো পর্যটন স্পটেই পর্যটকের রেকর্ড সংখ্যক উপস্থিতি দেখা গেছে। মূলত অন্য বছরের তোলনায় এবছর দেশের সামগ্রীক রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল ও নিরাপদ সহ টানা ৯দিন ছুটি থাকায় মৌলভীবাজারের পর্যটন স্পটগুলোতে বেড়েছে পর্যটক সংখ্যা। এতে লাভবান হচ্ছেন পর্যটন খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও পর্যটক বাড়ায় সরকারি খাতেও বেড়েছে রাজস্ব আদায়।
শ্রীমঙ্গল ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক কামরুল হোসেন চৌধুরী জানান, চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার পর্যটন স্পটগুলোতে এবছর পর্যাপ্ত ট্যুরিস্ট এসেছেন। আমরা ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে জেলা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্নয়ে তাদের পর্যাপ্ত দিয়ে যাচ্ছি।
এদিকে পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২০ ও ২০২১ সালের ভয়াবহ করোনা মহামারি ও বিগত বছরের বন্যার কারণে জেলার পর্যটন শিল্প ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব কারণে এখনো অনেক ব্যবসায়ী ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুরোপুরি। তবে এবার ঈদ স্বস্তির হওয়া ছাড়াও পরিবেশ স্থিতিশীল থাকায় পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। জানা যায়, ঈদে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের মধ্যে ৪০ শতাংশ পর্যটক থাকছেন হোটেল, রিসোর্ট সহ বিভিন্ন গেষ্ট হাউজে। বাকি ৬০ শতাংশ দিনে দিনে চলে যাচ্ছেন।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার যুগ্ম আহবায়ক সেলিম আহমদ জানান, ঈদের টানা ছুটি ৯দিন হলেও আমাদের ব্যবসা হচ্ছে ৪ দিনের। এর পর ঈদের পঞ্চম দিন থেকে কমতে শুরু করবে পর্যটক সংখ্যা। সব মিলিয়ে এবার কিছুটা লাভবান হবেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, এই খাতে ব্যাংকিং বিনিয়োগ না পাওয়ায় বড় কোন বিনিয়োগ করা যাচ্ছেনা। যার ফলে পর্যটন শিল্প বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জুড়ী থেকে পরিবার নিয়ে লাউয়াছড়ায় ঘুরতে আসা জনতা ব্যাংক কর্মকর্তা মো: আবুল কালাম বলেন, কাজের চাপে ঘুরা হয়না তাই ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে লাউয়াছড়া এসেছি। এখানে প্রচুর পর্যটক। বাচ্চারা বানর দেখে খুব খুশি। কারণ বানরগুলো ন্যাচারালি খুব কাছে আসছিল। তবে এখানে শুধু বানর দেখা যায়, আগে সাপ, হনুমান দেখা যেতো। এখন সাপও দেখা যায়না হনুমান আর বিভিন্ন ধরণের পাখিও দেখা যায়না। বন্যপ্রাণী গুলো লোক সমাগম বেশি হওয়ার কারণে হয়তো এখান থেকে সরে যাচ্ছে। খাবারের অভাবে বানরগুলো মানুষের হাত থেকে খাবার নিয়ে যাচ্ছে।
শ্রীমঙ্গলের বধ্যভুমি-৭১ এ দেখা হয় সিলেট থেকে আসা আশা কলেজ শিক্ষার্থী আতিয়া বেগমের সাথে। এসময় তিনি বলেন, ভ্রমণের জন্য বসন্তকালটা অন্যরকম, ঘুরাঘুরিতে মানুষের মনের ভাব ফুটে উঠে,তখন মানুষ অনেক জায়গায় ঘুরতে যায়। এখন ঈদের সময়,আবহাওয়া পরিবর্তন সহ ভরা রুদ্দুর। সবাই ঘুরতে আসছে। ভাল লাগছে কিন্তু বসন্তকালে ঘুরাটা সবচেয়ে ভাল। ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, এবারের ঈদ ভ্রমণ ভাল লেগেছে। ভিন্ন রকম, দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ শ্রীমঙ্গল আজকে এসে প্রমাণ পেয়েছি। সত্যি অনেক ভাল লেগেছে।