ইন্টারপোলের ৬৬ হাজার রেড নোটিশ মোস্ট ওয়ান্টেডদের নামে

আমিনুর রহমান তাজঃ আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা মোস্ট ওয়ান্টেডদের নামে এ পর্যন্ত ৬৬ হাজার ৩৭০টি রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। পলাতক এসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশে বা দেশের বাইরে খুন, প্রতারণা, সাইবার ক্রাইম, জালিয়াতি, মানব পাচার, মানি লন্ডারিং ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে রয়েছে যারা সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী।

গত ১৬ বছরে ইন্টারপোল পলাতক ৮০ জন বাংলাদেশী নাগরিকের নামে রেড নোটিশ জারি করে। এদের মধ্যে ১৬ জনকে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। বাকি ৬৪ জনের আপডেট কোন তথ্য মেলেনি। এরা সকলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এনসিবি সূত্র বলেছে, যাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দ-প্রাপ্ত আসামি, ’৭১ সালের যুদ্ধপরাধী, ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, মানি লন্ডারিং ও মানব পাচারকারীদের নাম রয়েছে।

এনসিবি সূত্রটি আরও জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দ-প্রাপ্ত আসামি রাশেদ চৌধুরী আমেরিকায়, নূর চৌধুরী কানাডায়, শরীফুল হক ডালিম পাকিস্তান, লিবিয়া বা লিবিয়ায়, খন্দকার আবদুর রশিদ আফ্রিকা বা পাকিস্তান এবং রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন ইউরোপে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। এদের সকলের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছে ইন্টারপোল।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ৬১ জন সন্ত্রাসীর নামে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। এদের মধ্যে সরকারের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, জিসান, তানভিরুল ইসলাম জয় ও শাহদাতের নাম রয়েছে। সন্ত্রাসীরা ভারত, দুবাই, নেপাল ও থাইল্যান্ডে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুনঃ  চাঁদপুর-২ আসনের এমপি নুরুল আমিন রুহুলের বোনের কুলখানি

অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৬৫৬ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। এই রেড নোটিশের তালিকায়, মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম, ছোটা শাকিল, ইকবাল মিরচি, জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা’র প্রধান হাফিজ সাঈদ, জাকি-উর-রহমান লাকভি, মাসুদ আজহার এবং নীরব মোদি, পুরবী মোদি ও মেহুল চোকসিসহ হাই প্রোফাইলের প্রতারকের নাম রয়েছে।

জানা গেছে, ইন্টারপোল থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭ হাজার করে রেড নোটিশ ইস্যু হয়। নোটিশ ইস্যুর অনুরোধ আসে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে। সংশ্লিষ্ট ব্যুরো আদালত ও থানার মামলা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্যাদি ইন্টারপোল সদর দফতরে পাঠায়। ইন্টারপোল সেগুলো যাচাই-বাছাই করে নোটিশ ইস্যু করে থাকে।

ইন্টারপোলের তথ্যমতে, প্রধানত মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই রেড নোটিশগুলো জারি করা হয়েছে। নোটিশগুলোর মধ্যে ৭ হাজার ৬৬৯টি নোটিশ জনগণের জন্য উন্মুক্ত। তবে বেশিরভাগ নোটিশই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য সংরক্ষিত। ইন্টারপোলের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) অনুরোধে রেড নোটিশগুলো বিভিন্ন সময়ে জারি করে সংস্থাটি। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ সালে সংস্থাটি জারিকৃত রেড নোটিশের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪১৮টি। ২০২১ সালে এই রেড নোটিশের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ হাজার ৩৭০টিতে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সদস্য দেশগুলোকে পলাতক অপরাধীদের ব্যাপারে সতর্ক করা। এই নোটিশের ফলে সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর পুলিশ লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের অবস্থান ও তাদের অপরাধের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হওয়া পূর্বক তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। ইন্টারপোল বলেছে, গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত পলাতক মোস্ট ওয়ান্টেডদের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের পুলিশ সদর দফতরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) অনুরোধের প্রেক্ষিতে তারা সাধারণত রেড নোটিশ ইস্যু করে থাকেন।

আরও পড়ুনঃ  নাগেশ্বরীতে ২'শ বছরের পুরনো গো-মূর্তি উদ্ধার

ইন্টারপোলের জারি করা এই রেড নোটিশ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আর্ন্তজাতিক সংস্থাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, রেড নোটিশ অনেক নিরীহ গণমাধ্যম, মানবাধিকার কর্মী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছছে। সদস্য রাষ্ট্র তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, রশিয়া, চীন, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ, ভেনিজুয়েলা, শ্রীলংকা ও ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে এই রেড নোটিশ অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব দেশ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য ইন্টারপোলের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনকে ব্যবহার করছে। এরমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইন্টারপোলে মোটা অনুদান দিয়ে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়েছে। দেশটি ৫৪ মিলিয়ন ডলার দান করেছে যা সংস্থাটির ১৯৪টি সদস্য রাষ্ট্রে দেয়া অনুদানের সমান।

‘ওপেন ডায়লগ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৪৪ জন হাই প্রোফাইল ব্যক্তির নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ফেয়ার ট্রায়ালস ইন্টারন্যাশনালের’ প্রধান নির্বাহী ‘জ্যাগো রাসেল’ অভিযোগ করেছেন, সংস্থার সদস্যভুক্ত বিভিন্ন দেশ ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিশের অপব্যবহার করছে। বিশেষ করে অনেক ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, মানবাধিকার, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের কর্মী এই হয়রানির শিকার। ইন্টারপোল বিভিন্ন রাষ্ট্রের নোটিশ জারি করা সংক্রান্ত অনুরোধগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখছে না বলেও অভিযোগে প্রকাশ। একই অভিযোগ করেছে ইউরোপীয় কমিশন হিউম্যান রাইটসও।

আরও পড়ুনঃ  করোনায় মুক্ত প্রকৃতিতে বর্ষা এসেছে কবিতায় ভর করে!

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ‘ফেয়ার ট্রায়ালস ইন্টারন্যাশনালের’ প্রতিনিধিরা ইন্টারপোল কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে রেড নোটিশ জারির বিষয়ে সতর্ক হওয়ার অনুরোধ জানান। ইন্টারপোলের মহাসচিব জুরগেন স্টক জানান, সংস্থার সদস্যভুক্ত দেশগুলোর রেড নোটিশ জারির অনুরোধগুলো পুংখানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার জন্য তারা একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করেন। এর প্রেক্ষিতে পুলিশ, আইনজীবি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নিয়ে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে ইন্টারপোল। এই টাস্ক ফোর্স কাগজপত্র যাচাই করার আগ পর্যন্ত কোন সদস্য রাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো দেখতে পাবেন না কার নামে নোটিশ ইস্যু করা হচ্ছে। রেড কর্নার নোটিশের অপব্যবহার রোধে ইন্টারপোল বেশকিছু পরিবর্তন এনেছে। ইন্টারপোল বলেছে, যেসব রেড কর্নার নোটিশ অপব্যবহার হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে সেগুলো ইতোমধ্যেই ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ‘ফেয়ার ট্রায়ালস ইন্টারন্যাশনাল’ সংস্থাটি বলেছে, ২০১৩ সালে তারা কিছু রেড নোটিশ জারির ক্ষেত্রে বেশকিছু ত্রুটি লক্ষ্য করেছেন। ইন্টারপোলের বেশকিছু সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে যাদের মানবাধিকারের রেকর্ড খারাপ, দুর্নীতিপরায়ণ ও অগণতান্ত্রিক সরকার মূলত তারাই রেড নোটিশ জারির অপব্যবহার করছে। ২০০৯ সাল থেকেই নোটিশের অপব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

সংবাদ সারাবেলা