পরিবেশবাদীরা কখনো পুঁজিবাদি হয় না

প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। আর, প্রকৃতির নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আমাদের জীবনে বিপত্তি নেমে আসবে। এটাই স্বাভাবিক।

|| শমশরে আলী ||

বিজ্ঞানী ও পরিবেশ কর্মীদের মত; পরিবেশ কর্মীদের মত; প্রকৃতির উপাদান মূলত: ৫টি যথা; সূর্যালোক, মাটি, পানি, বায়ু ও জীবন। আর ৫৯৭৪ বিলিয়ন[1] মে. টন ওজনের এই পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের মোট পরিমান অপরিবর্তনীয়। এর কোন একটার পরিবর্তন হওয়া মানে অন্য কোনটার পরিমান বা সংখ্যার তারতম্য হওয়া, অর্থাৎ ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়া। পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা সকলকে সুস্থ্ ও সুখী রাখতে পারে। তাই, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। আর, প্রকৃতির নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আমাদের জীবনে বিপত্তি নেমে আসবে। এটাই স্বাভাবিক।

পরিবেশ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় যুগে যুগে কিছু সচেতন মানুষ বা পরিবেশ কর্মী সক্রিয় ছিল, আছে ও থাকবে। গবেষণা ও বিজ্ঞান প্রসূত জ্ঞান বা প্রমান সাপেক্ষে পরিবেশ দূষণের প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সচেতন করতে পরিবেশ কর্মীরা অনেকে ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করে চলেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে পর্যন্ত প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে তেমন কোন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছিল না। তবে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠির আচার ও রীতিতে পরিবেশ সুরক্ষার নীতি ও পথপদ্ধতি কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। শিল্প বিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পুঁজির যোগান। এই পুঁজির অনেকটাই এসেছিল ঔপনিবেশিক ব্যবসা বাণিজ্য থেকে। দেখা যায়, ইংলান্ডের শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে ঔপনিবেশিকতার বিস্তার ও মানবাধিকারের হরণ হতে থাকে। শিল্প বিপ্লবের এই ধারা এখনো সচেষ্ট আছে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, আমেরিকা, রুশ প্রজাতন্ত্র ও গণচীনে। বাকি দেশগুলো এর ধারাবাহিকতার অংশ মাত্র। শিল্প বিপ্লবের ফলে যে পরিবেশ বিপর্যয়, তার অন্যতম সূচক হচ্ছে কার্বন নি:স্বরণ, জলবায়ুর অভিঘাত, বায়ু, মাটি ও পানি দূষণ, খাদ্যে বিষক্রিয়া, জনস্বাস্থ্যহানী ইত্যাদি।

আরও পড়ুনঃ  কুরুচির ভাইরাস ‌'গেন্দা ফুল' ও একজন রতন কাহার

ঊনবিংশ শতকের শুরুতেই বন সংরক্ষন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে কিছু মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। তা ধীরে ধীরে ব্যাপক সচেতনতা তৈরিতে সহায়তা করে এবং পরবর্তিতে বিশ্ব পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি জাতিসংঘের এজেন্ডাভুক্ত হয়। সেই চেষ্টা থেকে ১৯৭২ সাল থেকে ব্শ্বি পরিবেশের বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস ‍উদযাপিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বের সকল পরিবেশ কর্মী এই দিবস পালন করে থাকে। যখনই পরিবেশের নূন্যতম ক্ষতি হচ্ছে বা ক্ষতির কারণ দেখা দিচ্ছে, তখনই পরিবেশ কর্মীলা নির্দ্ধিধায় তার বিরুদ্ধাচরণ করছে, সুরক্ষায় সচেষ্ট হচ্ছে। কারণ, পরিবেশবাদীরা কখনোই পুঁজিবাদী হয় না।

পরিবেশবিরুদ্ধ কর্মকান্ডের ফলে গত তিন দশকে ঢাকা জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ জলাভূমি ও সারাদেশে শতাধিক নদ-নদী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উপরন্তু, সকল প্রকার শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদী, খাল, বায়ুমন্ডল ও মাটিতে মিশে যাওয়ায় মানুষসহ সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে বিষক্রিয়ার কারণে স্বাস্থ্যহানী, চিকিৎসাব্যয় ও জনভোগান্তি বাড়ছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের দেশীয় মাছের অন্তত ২০টি প্রজাতির আর কোন হদিস মেলে না। এবং ১০০টি মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত পায়। দেশীয় জাতের অনেক পশু পাখিও আজ বিপন্ন হতে চলেছে।

আরও পড়ুনঃ  আমাদের সড়ক আর নিরাপদ হলো না

পরিবেশ কর্মীদের দাবির মুখেও আজো সকল শিল্প কারখানার বর্জ্য পরিশোধেনের কেন্দ্রীয় শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপন বা সচল করা হয়নি। আর লাল ও কমলা ধরণের শিল্প-কারখানার জন্য পরিবেশ করও আরোপ করা হয়নি। তাছাড়া জনবহুল ও ক্ষুদ্রায়তনের এই দেশের আর কতো শিল্প কারখানার বর্জ্য ও দূষণের চাপ বইতে হবে? পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বন ও গাছকাটা বন্ধ করতে হবে। তার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে জাতিসংঘ প্রনীত আইনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অনুস্বাক্ষর করতে হবে এবং তা পালনে বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। এখনই পরিবেশের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে এই বিশ্ব সবার জন্যই বসবাসের অনুপযোগি হয়ে পড়বে।  

পরিবেশ কর্মীলা আর্থিক বা অন্য কোন ফায়দা হাসিল করতে কাজ করে না। তারা কারো ক্ষতি না করে নিজেদের ও পরবর্তি প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে। দেশের কর্ণধার হিসেবে সরকারের দায়িত্ব হলো, পরিবেশ কর্মীদের স্বদ্বিচ্ছার মূল্যায়ণ করা এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করা।

লেখক: সদস্য সচবি, নদী অধিকার মঞ্চ।


[1]

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সংবাদ সারাবেলা