অটিজম নিয়ে কুসংস্কার নয় দরকার সচেতনা

অটিজমের প্রতিটি শিশুই বিশেষ প্রতিভাবান সম্পন্ন। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে দক্ষতা থাকে। এমন অনেক শিশু আছে যারা অটিজম আক্রান্ত হলেও মাত্রা কম, তাদের অনেকেই স্বাভাবিক শিশুদের মতন লেখাপড়া করতে পারে। আবার অনেকের গাণিতিক দক্ষতা স্বাভাবিক শিশুদের থেকেও বেশি হয়ে থাকে।

|| শাহিদা আরবী ||

অটিজম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বহুল পরিচিত একটি শব্দ। শব্দটির পরিসর বাড়লেও, বাড়েনি অটিজম নিয়ে মানুষের ধ্যানধারণার। আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছে, যারা মনে করেন অটিজম বংশগত বা মানসিক একটি অসুখ। মূলত এটি কোন অসুস্থতা নয়। অটিজম একটি স্নায়ুগত সমস্যা। ইংরেজিতে যাকে বলে “নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডার”। মস্তিষ্কের বিকাশজনিত এই সমস্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন এটি আনেকটাই নিরাময়যোগ্য।

শাহিদা আরবী

অটিজম নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রতি বছর আজকের এই দিনে অর্থাৎ ২রা এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় “বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস”। এইদিন জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো “অটিজম স্পেকটার্ম ডিসঅর্ডার” আক্রান্তদের সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে সাতটি দিবস আছে, বিশ্ব অটিজম দিবস সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। অটিজম আক্রান্তদের জন্য  জাতিসংঘের গৃহীত এই বিশেষ উদ্যোগ তাদের অবস্থার পরিবর্তনে রেখে চলেছে দরকারি ভূমিকা।

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত। রয়েছে অটিজমের সুচিকিৎসা। তবুও এনিয়ে গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে।  গ্রামাঞ্চলে অটিজম নিয়ে জন্ম নেয়া এমন অনেক শিশু আছে, যাদের পরিবার তাদের সন্তানদের অটিজম শনাক্ত করতে পারেনা। যেহেতু এটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত রোগ, আক্রান্ত শিশুটি সমাজের সাথে সামাজিক কোন সম্পর্ক গড়তে পারে না। একই কাজ বারবার করতে থাকে। যেহেতু পরিবারগুলো তাদের সন্তানের এমন আচরণে উদাসীন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের আচরণের এই অস্বাভাবিকতা বাড়তে থাকে। ফলাফল সমাজ তাকে পাগল বলতে থাকে। এমনকি অটিজম আক্রান্তদের পরিবারগুলোকেও করা হয় হেয় প্রতিপন্ন। যা ঐ পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে তৈরী করে বাড়তি বিড়ম্বনা। যেহেতু এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তাই একটি শিশুর অটিজম যদি তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যায় সেক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়।

আরও পড়ুনঃ  ভারতে গ্রেফতার পুলিশ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

সাধারণত জন্মের ছয় মাসের মধ্যেই শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন, শিশু মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারা। চোখে চোখ রেখে কথা না বলা। একা থাকতে পছন্দ করা, তাদের দৈনন্দিন তালিকায় কোন পরিবর্তন আসলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখানো, অটিজমের এই  সহজাত আচরণ গুলো শিশুর মধ্যে দেখা মাত্রই বাবা মায়ের উচিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে তার অটিজম আক্রান্ত সন্তানকে লোকচক্ষুর আড়ালেই রাখতে চান। যা তার সন্তানের সমস্যা আরো বাড়াতে থাকে। বিপরীতে দ্রুত আটিজম শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলে তাদের জীবনেও অনেকটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

অটিজমের প্রতিটি শিশুই বিশেষ প্রতিভাবান সম্পন্ন। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই নির্দিষ্ট  কোন  বিষয়ে দক্ষতা থাকে। এমন অনেক শিশু আছে যারা অটিজম আক্রান্ত হলেও মাত্রা কম, তাদের অনেকেই স্বাভাবিক শিশুদের মতন লেখাপড়া করতে পারে। আবার অনেকের গাণিতিক দক্ষতা স্বাভাবিক শিশুদের থেকেও বেশি হয়ে থাকে। তাই কোনভাবেই তাদের পিছিয়ে পড়া শিশু ভাবা যাবে না। বরং তাদের দক্ষতা বাড়াতে তাদের পাশে থাকতে হবে। তাদের জন্য তৈরী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে অনেক ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অভিনব পাঠদান, বিশেষ থেরাপি এবং প্রত্যেকর আলাদা আলাদা দক্ষতা খুঁজে তাকে সে বিষয়ে পারদর্শী করে তোলে।

আরও পড়ুনঃ  কালিয়াকৈরে দেড় কিলোমিটার সড়কের বেহাল অবস্তা

অটিজম নিয়ে কুসংস্কার দূর করতে চাই সচেতনতা। প্রতিটি শিশুই সৃষ্টিকর্তার উপহার। কোন শিশুই বোঝা নয়। তবে অটিজমের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের অবস্থার পরিবর্তনে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে  অনেক এগিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া নানান উদ্যোগে আশা করা যায় একদিন অটিজম আক্রান্ত শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। সুযোগ পাবে নিজ দক্ষতাকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার। সমাজের কাছে স্বীকৃতি পাবে স্বাভাবিক শিশু হিসেবে।

তারাও দেশের সম্পদ। তারাও একদিন তাদের মেধা, সৃজনশীলতা দিয়ে দেশের জন্য সাফল্য বয়ে নিয়ে আসবে। শুধু প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের মেধা বিকাশে সাহায্য করা। শুধু “বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস” উপলক্ষে নয়, বছরের প্রতিটি দিনই তাদের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার সাথে করে যাওয়া যুদ্ধের সামিল হতে হবে সবাইকে। তাদের চলার পথটা যেন সহজ হয় সে লক্ষে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বব্যাপী পালিত এই অটিজম সচেতনতা দিবস যদি তাদের জীবনযুদ্ধে এক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে, তবেই এই দিবসের  সার্থকতা অর্জিত হবে বলে মনে করি।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সংবাদ সারাবেলা