কুড়িগ্রামে রাস্তা সংস্কারে অনিয়মে স্থায়ী হচ্ছে দুর্ভোগ

|| সারাবেলা প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম ||

কুড়িগ্রামে উন্নয়ন কাজে গতি নেই। যাওবা চলছে তাতেও ঘটছে বিস্তর অনিয়ম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থসামাজিক অবকাঠামো ও জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রের নিয়মিত প্রয়োজনীয় বরাদ্দ আসছে। সময় মতো টেন্ডার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হচ্ছে। কিন্তু কার্যক্রম উদ্বোধনের পরই শুরু হয় মন্থরগতি। নানান অজুহাতে ঠিকাদাররা বারবার সময় বাড়িয়ে নিয়ে নির্ধারিত তারিখ পেরোলেও বছরের পর বছর কাজ অসমাপ্তই থেকে যাচ্ছে। ফলে  বেড়েই চলেছে জনদূর্ভোগ। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে মানুষের।

আগের রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন ফেলে রেখে চলাচলের অযোগ্য করে তোলা হচ্ছে। সঠিক সময়ে রাস্তা সংস্কারের দাবীতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে বার-বার তাগাদা দিয়েও লাভ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে চলাচলের অনুপযোগী এলাকার মানুষ রাস্তা অবরোধ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করছে। গ্রামীণ সড়ক সংস্কারের দাবীতে কুড়িগ্রামের মানুষ আন্দোলন করলেও কোন কাজ হচ্ছে না।

প্রসঙ্গত গেলো বছর পরপর ছয় দফা বন্যায় ভেঙ্গে পড়েছে জেলার সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট জরুরি মেরামত ও সংস্কার হলেও গ্রামীণ জনপদের সড়ক এখনো সংস্কার হয়নি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও চলাচলের অনুপযোগী, খানা খন্দেভরা রাস্তা দিয়ে ভারী যানবাহনসহ পথচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করছে।

আরও পড়ুনঃ  বিক্ষোভ দমনে ট্রাম্প এখন ‍“প্রেসিডেন্ট অব ল এন্ড অর্ডার”

সরেজমিন-কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় উলিপুর বজরা চিলমারী রোড। দুই উপজেলার প্রায় ১৫ লাখ মানুষের যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে ঠিকাদার কাজ শুরু করেন ২৪শে ডিসেম্বর ২০১৮ সালে। দরপত্র অনুয়ায়ী ২০১৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় “মেসার্স মোজাহার এন্টার প্রাইজ” নামে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার টেন্ডার আইডি নং-২২৬২১৩, প্রাক্কলিত মূল্য ৩৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ করবে মর্মে সড়ক বিভাগের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেও এখনো কাজ শেষ করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টার প্রাইজ। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মাস অতিবাহিত হলেও কাজ শেষ না করার কারণ জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউই মুখ খোলেননি। মোজাহার এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারীর মোবাইলে একাধিকবার কল ও খুদেবার্তা পাঠনো হলেও তিনি এই প্রতিনিধির সাথে কোন কথা বলেননি।

কুড়িগ্রাম-চিলমারী রোড, একই নামে নেয়া আরও একটি কাজ, যার আইডি নং-৭৫৬২১, কাজ শুরুর তারিখ ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ইং। কাজ শেষ করার তারিখ ১৯শে নভেম্বর ২০২০ নির্ধারণ করা হলেও অদ্যাবধি ওই কাজের ১০ শতাংশ সম্পন্ন  হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই রাস্তায় কর্মরত একজন লেবার সর্দার জানান, মোজাহার এন্টার প্রাইজ সারাদেশে কাজ নেয় এবং উদ্বোধনের পরপরই ওই কাজ বন্ধ রেখে অন্য জেলায় কাজ শুরু করে তাহলে ক্যামনে ঠিক সময়ে কাজ শেষ হবে? এই প্রতিষ্ঠানের কোন নিয়মনীতির বালাই নাই। তারা তাদের ইচ্ছে মতো কাজ করে। চলাচলের জন্য এই রাস্তা দীর্ঘ দিনেও সংস্কার না করে উল্টো খানাখন্দ গর্ত খুঁড়ে মরণফাঁদে পরিণত করা হয়েছে রাস্তাটি। 

আরও পড়ুনঃ  এনায়েতপুরে ডা. নাজমুলের লাম্পট্যের কিনারা করতে পারছে না কেউ

চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী বীরবিক্রম বলেন, সড়ক বিভাগকে বারবার বলা হলেও টালবাহানা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় কয়েক লাখ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এই ঠিকাদারের কারণে জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার বেহাল অবস্থা।

মোজাহার এন্টার প্রাইজ-এর প্রাপ্ত সকল কাজেই এ রকম দীর্ঘসূত্রতা, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ও নানা অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছে। মোজাহার এন্টার প্রাইজের এহেন অনিয়ম, দূর্ণীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াতো দুরের কথা, উল্টো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সাফাই গায় সড়ক বিভাগ। কাজ দেখাশুনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা ঐ ঠিকাদারের ভয়ে তটস্থ।

জনৈক প্রকৌশলী জানান, কাজের অনিয়মের অভিযোগ করলেই শুরু হয় হেনস্তা, এমনকি করা হয় শাস্তিমূলক বদলি।

সড়ক ও জনপদ বিভাগের রাঘব-বোয়াল হিসেবে পরিচিত মোজাহার এন্টার প্রাইজের কারণে যাতায়াতে দূর্ভোগের শিকার কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ। সরকারী কাজে নয়-ছয় করেও সঠিক সময়ে কাজ শেষ না করে জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টিকারী ঠিকাদার মোজাহার এন্টার প্রাইজ জনবান্ধব এই সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে। দাপটে অনিয়ম, দূর্ণীতি করেও বহাল তবিয়তে একের পর এক শত-শতকোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন কিভাবে? তার খুঁটির জোর কোথায়,  জানতে চায় জেলাবাসী।

আরও পড়ুনঃ  মহাসড়কে অবৈধ হালকা যান বন্ধে হবিগঞ্জে কাল থেকে বাস ধর্মঘট

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি জানতে চাইলে, কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম অজুহাত দেখিয়ে ঠিকাদারের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ওই রাস্তার কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। কাজে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সংবাদ সারাবেলা