সকল স্বাধীনতা নিশ্চয়নের উৎস হোক ৭ই মার্চের ভাষণ

ভাষণটির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল এর সার্বজনীনতা ও মানবিকতা। যে কোনো নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য এ ভাষণ সবসময়ই আবেদনময়। এ ভাষণে গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধিকার, মানবতা এবং সব মানুষের কথা বলা হয়েছে। ফলে এ ভাষণ দেশকালের গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়েছে সার্বজনীন।

|| মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ ||

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এদিনে ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৮ মিনিটের এক ভাষণের জাদুমন্ত্রে বাঙালি জাতিকে মুক্তির স্বপ্নে উজ্জিবিত করেছিলেন। তাঁর ভাষণে তিনি স্বাধীনতার যে ডাক দিয়েছিলেন তা বাঙালির মনে সারাজীবন অণুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। শোষিত, বঞ্চিত, মুক্তিকামী ও লাঞ্ছিত মানুষকে মুক্তি ও স্বাধীনতার আন্দোলনের আহ্বানে ঋদ্ধ তাঁর ঐতিহাসিক সেই ভাষণে সাড়া দিয়েছিলেন বাংলার লাখো জনতা।

কালজয়ী ভাষণে আগুন ঝরা কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মূলত ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিদেরকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ভাষণের সেই ধারাবাহিকতায় ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালে জাতির পিতা ঘোষণা করেন বাঙালি জাতির বহুকাঙ্খিত স্বাধীনতা।

সঙ্গত কারণে এদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। কারণ ৭ই মার্চের ভাষণের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ভাষণ তাই মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার এক অনন্য উৎস।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনে ৭ই মার্চে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের তাৎপর্য অনেক গভীর। ১৮ মিনিটের এই ভাষণের প্রভাব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপর কতটা পড়েছিল তা ঠিক ১৮ দিন পরই দৃশ্যমান হয়। অর্থাৎ ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনারা ঢাকা শহরে শুরু হয় গণহত্যা। জ্বালিয়ে দেয়া হয় মানুষের আবাসন, স্কুল কলেজ ও অফিস আদালত।

আরও পড়ুনঃ  সুইডেনের করোনা কৌশল ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

সেদিনই বাংলাদেশের মানুষ যে যার অবস্থান থেকে নিজেদের নিয়োজিত করে মুক্তিপ্রতিবাদে। নয়মাস নিজের শেষ রক্ত দিয়ে লড়ে গেছে দেশের জন্য একটি সুন্দর লাল সবুজের পতাকার জন্য। নির্দিধায় বলা যায়, বাঙালীর এই উজ্জীবনের পেছনে যে শক্তি কাজ করেছে তা হলো বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ।

এই ভাষনের ধারাবাহিকতায় আজ আমরা পেয়েছি স্বাধীন ভূমি, পেয়েছি নিজেদের অধিকার, পেয়েছি লাল সবুজের দেশ আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ দেশাত্মবোধ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির এবং লক্ষ্য অর্জনে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রকাশ পেয়েছিলো। যার মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তি। ভাষণটির মধ্য দিয়ে বাঙালির সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও বঞ্চনার ইতিহাস, গণতান্ত্রিক চেতনা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, শান্তির বাণী, মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা ফুটে উঠেছে।

ভাষণটির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল এর সার্বজনীনতা ও মানবিকতা। যে কোনো নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য এ ভাষণ সবসময়ই আবেদনময়। এ ভাষণে গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধিকার, মানবতা এবং সব মানুষের কথা বলা হয়েছে। ফলে এ ভাষণ দেশকালের গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়েছে সার্বজনীন।

বিশ্বজনীনতা ও মানবিক গুণের কারণেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়েছে। তিনি যে অধিকারের কথা বলেছেন, তা সারা বিশ্বের সব মানুষের অধিকার। সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কথা, স্বাধীনতাবঞ্চিত মানুষের কথা বলেছেন তিনি তার ভাষণে। একজন নেতা কিভাবে একটি জাতিকে, একটি দেশকে একত্রিত করতে পারেন, একই দাবিতে সোচ্চার করতে পারেন- পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম দ্বিতীয় নজির নেই। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ একটি জনগোষ্ঠীর মুক্তির কালজয়ী এক মহাকাব্য।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশা, শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে যে কণ্ঠ ধ্বনিত হয়েছিল; যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তার কোনো তুলনা নেই।

বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে এই ভাষণ মুক্তিপ্রেরণার উৎস। যতদিন যাবে নতুন প্রজন্মের কাছে ৭ই মার্চের ভাষণ অনুপ্রেরণার সারথি হিসেবে কাজ করবে। তরুণ প্রজন্ম এই ভাষণের প্রেরণায় জাতির জনকের সোনার বাংলাকে বিশ্বের বুকে একদিন উজ্জ্বল-ভাস্কর হিসেবে তুলে ধরবে। আমরা যারা স্বাধীনতার পরে জন্মগ্রহণ করেছি এ ভাষণটি সরাসরি দেখতে বা শুনতে পারিনি। কিন্তু আজও যখন এই ভাষণ শুনি, তখনই আমরা উজ্জীবিত হই। নব উদ্যমে এগিয়ে চলার প্রেরণা পাই। ভাষণটি বর্তমান প্রজন্মকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদী হতে হয় সে শিক্ষা দেয়। কীভাবে মাথানত না করে অবিচল থাকতে হয় আর কিভাবে সামনে দিকে এগিয়ে যেতে হয় সে বিষয়গুলোও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য একেকটি স্বতন্ত্র অর্থ বহন করে, নতুন বার্তা দেয়।

জ্বালাময়ী এ ভাষণ নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছে কিভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়, অন্যের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না দিয়ে, উসকানি না দিয়ে কিভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয় সেই শিক্ষা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। আর সেজন্যই এই ভাষণ তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে, প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে, এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। ভাষণটি উজ্জীবিত করে, এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়। বাংলার তরুণ সমাজ যদি বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের মাধ্যমে দেওয়া নির্দেশনা গুলোকে অনুপ্রেরণা হিসেবে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে থাকে তাহলে আগামীতে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। যতদিন বাংলাদেশ আর বাঙালী রবে এ পৃথিবীতে ততদিন লাল-সবুজের পতাকা উড়বে বিশ্বজুড়ে।

আরও পড়ুনঃ  কুরুচির ভাইরাস ‌'গেন্দা ফুল' ও একজন রতন কাহার

লেখক: শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি সংবাদ সারাবেলা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। উপ দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সংবাদ সারাবেলা