বাতিল হলো লক্ষ্মীপুরের সংসদ সদস্য পাপুলের সদস্যপদ

|| সারাবেলা প্রতিনিধি, লক্ষ্মীপুর ||

লক্ষীপুর সংসদীয় আসন-২ রায়পুরের স্বতন্ত্র প্রার্থী সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের সদস্যপদ  বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। প্রজ্ঞাপনের পরপরই নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আসনে নির্বাচন করতে প্রস্ততিও রয়েছে তাদের।

স্পিকারের চিঠি পেয়েই সোমবার পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। সোমবার সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, কুয়েতের ফৌজদারি আদালত কর্তৃক গত ২৮শে জানুয়ারি তারিখে ঘোষিত রায়ে নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে ৪ (চার)  বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ায় ২৭৫ নম্বর লক্ষীপুর-২ হইতে নির্বাচিত মোহাম্মদ শহীদ ইসলাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য নহেন। সেই কারণে সংবিধানের  ৬৭ (১) ( ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রায় ঘোষণার তারিখ ২৮. ০১.২০২১ তারিখ হইতে তাহার আসন ২৭৫ (লক্ষ্মীপুর-২) শুন্য  হইয়াছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ (৪) বিধি অনুযায়ী ২৭৫ লক্ষ্মীপুর-২ এর নির্বাচিত সংসদ সদস্যের আসন শুণ্য সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারী করা হইলো।

ছবি: সংগৃহিত

এদিকে কুয়েতে দণ্ডপ্রাপ্ত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ না থাকার বিষয়ে স্পিকারের চিঠি পেয়েই ব্যবস্থা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইনানুযায়ী পাপুল দুই বছরের বেশী সময়ের জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তার এমপি পদ থাকছে না। গত সপ্তাহেই নির্বাচন কমিশনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  নকলের ভীড়ে চেনাদায় কুমিল্লার আসল রসমালাই

প্রসঙ্গত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ (১) (ডি) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য হওয়ার এবং সদস্য সংসদ থাকার যোগ্য হবেন না যদি তিনি অনুচ্ছেদ ৭৩, ৭৪, ৭৮, ৭৯, ৮০, ৮১, ৮২, ৮৩, ৮৪ এবং ৮৬-এর অধীন কোন অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়ে অনুন্য দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে থাকেন, তার মুক্তি লাভের তারিখ থেকে পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে। এছাড়াও সংবিধানের ৬৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য দুই বছরের অধিক সময়ের জন্য দণ্ডিত হলে এবং সেই রেকর্ড সংসদের কাছে পৌঁছালে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ আসন শূন্য ঘোষণা করা হবে। সেই অনুযায়ী স্পিকার তার সদস্যপদ বাতিলের জন্য নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছেন। 

যা বলছে নির্বাচন কমিশন

কমিশন সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, “আসন গেজেটর কপি আমরা হাতে পেয়েছি। পরবর্তী করনীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে।” নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সাংবিধানিকভাবে পাপুলের আসন শূন্য ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সেখানে নির্বাচনের ব্যবস্থা নেবে ইসি।  তিনি বলেন, “সংসদ সচিবালয়ের চিঠি কমিশন সভায় উপস্থাপনের পর সার্বিক বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করব। নির্বাচন করতে ৪০-৪৫ দিন সময় হাতে লাগবে আমাদের। ২রা মার্চ হালনাগাদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপরই তফসিল ঘোষণা করা হবে।”

আরও পড়ুনঃ  করোনায় আক্রান্ত বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি

অর্থ ও মানব পাচার এবং ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে গত বছরের জুনে কুয়েতে গ্রেফতার হন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র এমপি পাপুল। গত ২৮শে জানুয়ারি তাকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি আদালত।

পাপুলের হয়ে ওঠা

সাধারণ শ্রমিক হিসাবে কুয়েত গিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়া পাপুল ২০১৮ সালে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

ওই নির্বাচনে ওই আসনটি আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রার্থী শেষ মুহূর্তে ভোট থেকে সরে দাঁড়ালে ‘বিএনপি ঠেকানোর’ কথা বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ পাপুলের পক্ষে কাজ করে বলে দলটির নেতাদের ভাষ্য।

পাপুল নিজে এমপি হওয়ার পর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কোটায় পাওয়া সংরক্ষিত একটি আসনে তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামকে এমপি করে আনেন।

ছবি: সংগৃহিত

প্রবাসী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন পাপুল,যেখানে তার বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে। পাপুলের মালিকানাধীন মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি কাজ করেন বলে কুয়েতে বাংলাদেশি কমিউনিটির ধারণা।

পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে গত জুনে গ্রেফতারের পর পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচার, অর্থপাচার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ আনা হয়। পরে তদন্ত করে পাপুলসহ নয়জনের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, মানবপাচার, ঘুষ লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগ আনে কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশন।

আরও পড়ুনঃ  খুন আর সংঘর্ষের ভোট চট্টগ্রামে

অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে গত বছরের ১৭ই সেপ্টেম্বর পাপুলের মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়। জানুয়ারিতে আদালত যে রায় ঘোষণা করে, তাতে পাপুলের কাজে সহায়তাকারী হিসাবে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাজেন আল জারাহ এবং কুয়েতি দুই কর্মকর্তাকেও চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ওই দুই কর্মকর্তা ছিলেন পাপুলের বিভিন্ন কাজের মধ্যস্থতাকারী এবং এজেন্ট। পাপুলসহ দণ্ডিত প্রত্যেককে ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে ওই রায়ে।

বাংলাদেশে দুদকও পাপুল,তার স্ত্রী,শ্যালিকা ও মেয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ও মেয়ে ওয়াফা ইসলাম সেই মামলায় জামিনে আছেন।

পাপুল গ্রেফতার হওয়ার এবং সাজা পাওয়ার পর তা বিধি অনুযায়ী না জানায় তখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সংসদ সংসদ।

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সংবাদ সারাবেলা