স্বীকৃতি না পাওয়া মুক্তিযোদ্ধার দিন চলে ভিক্ষা করে

|| সারাবেলা প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ ||

একাত্তরে দেশমাকে স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মখলিছ আলী। তিনি সুনামগঞ্জের  দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের ডুলপশি (নয়াগাঁও) গ্রামের বাসিন্দা। একাত্তরে জীবন বাজি রেখে সেলা (বাঁশতলা) সাব-সেক্টরের হারিণাপাটি, টেংরাটিলা, নরসিংপুর, বড়োগল্লা, গোবিন্দগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মখলিছ আলী দেশকে পাকিস্তানি সেনাদের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত করতে একাত্তরে যুদ্ধসময়ের কমান্ডার খোরশেদ আলমের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। একই ইউনিয়নের সহযোদ্ধা কাটাখালী গ্রামের আকিল আলী, মান্নারগাঁও গ্রামের রবি দাস, টেংরাটিলা গ্রামের আজিম উদ্দিনের সাথে ভারতের ইকোওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে ২৫ নম্বর ব্যাচে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। এমনভাবে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করলেও তিনি আজো রাষ্ট্রিয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সহযোদ্ধা সকলে ভাতাপ্রাপ্ত হলেও ৭৫ বছরের মখলিছ আলী কাগজপত্রের জটিলতায় অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন। ৭১-এর আগস্ট থেকে পাকবাহিনীকে সারেন্ডার করানোর পূর্ব পর্যন্ত সক্রিয় যুদ্ধে ছিলেন এই যুদ্ধবীর। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর বাড়ি ফিরে আবারও শুরু হয় তাঁর জীবনযুদ্ধ। এই যুদ্ধে লড়তে লড়তে ক্লান্ত এই রণবীর এখন অসহায়।

তিনি জানান, ১৯৮৮ সালের বন্যায় বসতঘরের সাথে পানিতে ভেসে যায় মুক্তিযুদ্ধের সকল কাগজপত্রও। বহু বছর ধরেই সরকারি দফতর, সহযোদ্ধাদের কাছে গিয়েও কাগজপত্রের জটিলতা সমাধান করতে পারছেন না। দেশ স্বাধীনের পর কিছুদিন যুদ্ধকালীন ৫নম্বর সেক্টরের সেলা (বাঁশতলা) সাব-সেক্টর কমান্ডার হেলাল উদ্দিন প্রদত্ত হেলাল ভাতা পেলেও সরকারি ভাতা থেকে বঞ্চিত এই বীরসেনা। নেই নিজের কোন ভিটেমাটি। দীর্ঘ তিন দশক যাবত স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন অন্যের বাড়িতে। বর্তমানে দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের ডুলপশি (নয়াগাঁও) গ্রামের তাজউদ্দীনের বাড়িতে তার আশ্রয়ে পরিত্যক্ত একচালা ছোট কুঁড়ের ঘরেই স্ত্রীকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। জীবন চালান ভিক্ষা করে, কখনও কখনও গ্রাম-পঞ্চায়েতের সহযোগিতা নিয়ে। সংসার জীবনে এক মেয়ে, ৩ ছেলের জনক হলেও ছেলেরা বাবা ও মাকে ফেলে চলে গেছে অন্যত্র।

আরও পড়ুনঃ  মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক এমপি আজিজুর রহমান আর নেই

ছেলেরাও শ্রমিকের কাজ করে। তাদেরও নেই কোন ভিটেমাটি। অন্যের বাড়িতে থেকে শ্রমিকের কাজ করে চলে তাদের জীবন-জীবিকা।এখন মখলিছ আলীর বয়স হয়েছে, একেবারেই নুহ্য। ছেলেরাও কেউ পাশে নেই। মজুর হিসেবে কাজ করতেও পারেন না। তাই সংসারের চাকা ঘোরাতে কাঁধে নিয়েছেন ভিক্ষার ঝুলি। ভিক্ষা করেই ৭৫ বছরের মানুষটি এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। চোখের পানি ঝরানো ছাড়া মখলিছ আলীর এখন আর কিছুই করার নেই। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৯ বছর পার করেছে বাংলাদেশ। পাল্টে গেছে এই বাংলার চিত্র। কিন্তু পাল্টায়নি মখলিছ আলীর ভাগ্য। মখলিছ আলী একজন ট্রেনিংপ্রাপ্ত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। জীবিত সহযোদ্ধারাও তা অকপটে স্বীকার করেন। যাচাই বাছাইয়ে বহুবার চাক্ষুষ সাক্ষীও দিয়েছেন। কিন্তু কাগজপত্রের জটিলতায় বঞ্চিত রয়েই গেলেন। এ যেন এক অন্যরকম সমীকরণ। ভাতা বঞ্চিত এই অসহায় মুক্তিযোদ্ধার সাথে আলাপ করে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর থেকে বার বার আবেদন করেও এ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেননি।

তাঁরই সহযোদ্ধা দুর্গাপুর গ্রামের ভাতাপ্রাপ্ত বীরমুক্তিযোদ্ধা কালামিয়া বলেন, মখলিছ আলী একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আমরা এক সাথে ট্রেনিং করেছি, একই সাথে দেশ স্বাধীন অবধি যুদ্ধ করেছি। আমাদের কাগজপত্র সংরক্ষণ থাকলেও তাঁর কাগজপত্রের জটিলতায় তিনি আজও বঞ্চিত। একই কথা বলেছেন তাঁর আরেক সহযোদ্ধা কাটাখালী গ্রামের আকিল আলী। তিনি বলেছেন, আমরা এক সাথেই যুদ্ধ করে দেশকে পাকিস্তানি শাসকদের দু:শাসন থেকে মুক্ত করেছি, অথচ কাগজপত্রের জটিলতার কারণে মখলিছ আলী আজ বঞ্চিত। জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে আজ মানবেতর জীবন যাপন করছে।

আরও পড়ুনঃ  কাদের বললেন আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশী জনপ্রিয় শেখ হাসিনা

মখলিছ আলী বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেও এখন পর্যন্ত মেলেনি মুক্তিযোদ্ধা সনদ। পাইনি কোনো ভাতা বা সরকারি সাহায্য। তাই ভিক্ষার ঝুলি আমার একমাত্র সম্বল। তিনি আরো বলেন, যখন শরীরে শক্তি ছিল তখন কাজ করে সংসার চালাতাম। এখন আর শরীরে শক্তি নাই তাই কেউ কাজেও নেয় না। সংসার চালাতেই ভিক্ষার ঝুলি নিয়েছি। ভিটেমাটি নেই থাকি অন্যের বাড়ি। তাঁর ভিটেমাটি নেই, থাকেন অন্যের আশ্রয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার থেকেও তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। পাননি ভিটেমাটি ও গৃহহীন হিসেবে একখানা পাকাঘরও। প্রধানমন্ত্রীর উপহার থেকেও কেন গৃহহীন মখলিছ আলী বঞ্চিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি সদস্য অজিত চন্দ্র প্রজিৎ সংবাদ সারাবেলাকে বলেন, মখলিছ আলী একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও গৃহহীন। তিনি থাকেন অন্যের বাড়িতে। কিন্তু এই এলাকায় বাড়ি করার মতো সরকারি খাস ভূমি না থাকায় অসহায় এই বৃদ্ধা মুক্তিযোদ্ধার পাকাঘর বানিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবুও তাঁর বিষয়ে আমি ইউএনও ম্যাডামকে জানিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানার মোবাইল নাম্বারে বার বার যোগাযোগ করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা দেয়া হলে খাস ভূমি না পেলেও অন্যত্র আমরা গৃহহীন ওই মুক্তিযোদ্ধাকে ঘর বানিয়ে দেব।

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সংবাদ সারাবেলা