কোন এক রাধিকা রমণ ও ছলেমানি খাব

|| আলী রেজা ||

বন্যার পানি যেভাবে বাড়তাছে এভাবে আর দু-একদিন বাড়লে বাড়ী-ঘর সব ঢুইব্যা যাবে। এইসব দুশ্চিন্তা করতে করতে কখন যে দু চোখ লাইগা আইছে টেরও পাই নাই। এখন ঘুমটাও বড্ড পাতলা। সামান্য শব্দে ঘুম ভাইঙ্গা যায়। এত রাইতে গরুটা যে কেন ডাকতাছে। হাতের কাছে মোবাইলটাও খুঁইজা পাই না। আগে সিগারেট খাইতাম, ম্যাচ রাখতাম। অহন সিগারেটও নাই ম্যাচও নাই। ঘরের মধ্যে ঘুটঘুটে আন্ধার, এই আন্ধার হাতড়াইয়া মোবাইলটা খুঁইজা বার করতে হইব। টর্চটা জ্বালাইয়া ঘরের বাইরে গিয়া দেহি গোয়াল ঘরে পানি ঢুইকা গেছে। তাই গরুগুলি ডাকতাছে। গরুগুলার পিঠে হাত বুলাইয়া দিয়া ঘরে গিয়া আবার শুই।

প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টারী। সামান্য বেতন। দিন দিন খরচ বাড়তাছে। দুইটা অতিরিক্ত রোজগারের আশায় এবার কুরবানীর বাজাররে সামনে রাইখা এই গরু পালনের প্রজেক্টটা্ হাতে নিছি। আমাদের সোহেল ভাইও দু-চাইরটা গরু নিয়া শুরু করছিল। এখন ছোটখাট খামারী। তার ফার্মে দুই জন মজুর খাটে। তার পরামর্শ অনুযায়ী এনজিও থিইক্যা ৪০ হাজার টাকা লোন নিয়া ৩ টা গরু কিনছি। মাস চারেকের বিনিয়োগ। আর ক’দিন পরে কুরবান। কুরবানের বাজারটা গতবারের চেয়ে একটু তেজী হইলেই সুদসহ ঋণ শোধ কইরাও হাতে কিছু টাকা থাকবে। তা দিয়া আগামী মৌসুমের জন্য অন্তত ডবল গরু কিনতে পারব। এইভাবে হয়ত সোহেল ভাই বা ফয়েজ মাষ্টারের মত একদিন একটি গরুর খামারের মালিক আমিও হব।

জানালার ওপাশ থাইক্যা ব্যাঙের ডাক শোনা যাইতাছে, ডাকটা আস্তে আস্তে দুর্বল হইয়া পড়তাছে। মনে হয় সকাল সকাল সাপের ব্রেকফাষ্ট। সাপেও ব্যাঙ খায়, চাইনিজরাও খাও, অনেক মাইনষেও খায়। আমরা খাই কচু-ঘেুচু আর গরুর-গোস্ত, ওপারে কেউ কেউ গরুর মুতও খায়, গুও নাকি মাখে।

নাহ, বেলা বাড়তাছে, সক্কাল সক্কাল হাটে যাইতে হইব। ঢাকার বাজারের খবর নেওয়া দরাকর। রহম চাচার ছেলে খলিল সরকারী চাকুরী করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বড় সাহেবের খাস পিয়ন। মেলা রোজগারপাতি। বড় সাহেবের রুমে ফাইল ঢুকাইলে আর বার করলেই ট্যাকা, সাহেবেরা দু-পাঁচশো টাকা বকশিশ দেয়। এবার মসজিদে নতুন দুইটা মাইকও কিনে দিছে। জবরদস্ত আওয়াজ, কেউ চাইলেও বিছানায় শুইয়া থাকতে পারব না।

খলিলরে ফোন দেয়া দরকার, হে ঢাকার বাজারের হাল হাকিকত জানাইতে পারব। গতবার খলিল সত্তর হাজার টাকায় গরু কুরবানী দিছে। পিয়নের চাকুরী না নিয়া কেন যে মাষ্টার হইলাম। পিয়নের চাকুরিতে পড়া লেখা বেশী লাগে না, কিন্তু বকশিশ-টকশিশ মিলাইয়া আয় ভাল। মাইনষে চাকুরি করে টাকার জন্য, টাকা পাইলে যে কোন কাম করন যায়। হুজুররে একদিন জিগাইতে হইব ঘুষের টাকায়, বকশীশের টাকায় কুরবানী হয় কি না। আর বকশিশ যদি বেতনের চাইতে চার পাঁচগুণ বেশী হয়, তাইলে হেইটা কি হালাল রুজি। কি জানি। তবে হুজুরেরা টাকাওয়ালা মানুষগুলোরেে কেন জানি খুব মান-ইজ্জত করে। যার টাকা নাই তার কেউ নাই, এমনকি সোনাটাও নাই।
এককাপ চা খাওয়া দরকার। সকালে হাটে যাওয়ার আগে শিল্পী ভাবীর সাথে দেখা কইরা যাইতে হইব।

শিল্পী ভাবী ফুফাত ভাই সাদ্দাম হোসেনের বউ। সাদ্দাম ভাই বিয়া করছে বছর দুই হইল। ওমানে ইলেকট্রিশিয়ানের চকুরি করে । ভাবী কাজীর পাগলা কলেজের ছাত্রী ছিল। হাটে গেলে ফুপুর জন্য ইসবগুলের ভুষি ও কালিজিরার তেল আনার ফরমায়েশ দিছে। ফুপুর অনেক কাজ করতে আমার মন না চাইলেও ভাবী কোন কাজ দিলে কেন জানি না করতে পারি না। ভাবীর ফুট-ফরমায়েশ খাটতে বরং ভালই লাগে, অই সুবাদে ভাবীর কাছে আসা যায়। ভাবীর চুলের একটা কেমন কেমন গন্ধ আছে, গন্ধটা মাঝে মাঝে ভাল লাগে। মানুষের শরীরে তার নিজের গন্ধের চেয়েও কেনা গন্ধ বেশী থাকে। যেমুন চুলের গন্ধ মানে শ্যাম্পুর গন্ধ, গায়ের গন্ধ মানে সেন্টের গন্ধ, আতরের গন্ধ। ভাবী আতর পারফিউম দুটোই মাখে। সাদ্দাম ভাই নিয়া আসে, অনেক সময় পরিচিত কেউ দেশে আসলে তাদের মাধ্যমে পাঠায়। তবে ভাবী পারফিউম বেশী পছন্দ করে। কেনা গন্ধের জন্য মানুষের শরীরের গন্ধ সহজে পাওয়া যায় না। মানুষের শরীরের গন্ধ পাইতে হইলে তার শরীরে ঢুকতে হয়।

হাট থিইক্যা ফিরা সোজা ফুপুর ঘরে। ফুপুর ঘরে ঢুইকা দেখি ফুপু নাই। ফুপুরে ডাকি কিন্তু কোনো আওয়াজ পাই না। সম্ভবত বাড়ীতে নাই। এবার ভাবীর ঘরে ঢুকি। দরজাটা লাগানো ছিল। একটু ধাক্কা দিতেই ক্যাচ-ক্যাচ আওয়াজ কইরা খুইলা যায়। না এইখানেও ভাবী নাই। ভাবীর ঘরের সাথে এটাচড বাথরুম। আগে এই বাথরুম ছিল না। সাদ্দাম ভাই বিয়ের সময় রুমটা ভাইঙ্গা নয়া বাথরুম তৈরী কইরা দিছে। এইটারও শানে নজুল আছে। বিয়া কইরা মাস খানেক বউয়ের লগে থাইকা কাজে ফেরত যাইতে হইব। তারপর ফিরা আসতেও এক-দুই বছর লাগতে পারে, তার আগে আসা যাবে না। এই লম্বা সময়ের বিরহ, অপ্রেম, অবদমন এগুলো ভুইলা থাকতে বউয়ের লগে যত পারা যায় ফোনালাপ করা দরকার। আর ফোনে একান্তে কথা কইতে একটা আলাদা রুম লাগে। এমন একটা রুম, যেইখানে যখন তখন কেউ ঢুইকা পড়ব না। তাদের অন্তরঙ্গ কথার ব্যাঘাত ঘটাবে না। এই কারণেই এটাচড বাথরুম করা। ভাবীরে সেই সাথে একটা স্মার্ট ফোনও কিইনা দিছে। ভাবীও স্মার্ট ফোনে ফোর-জি’র ভাল ব্যবহার জানে। ইমো এ্যাপস নামাইয়া নিছে। ভাবী রসের কথা কয়, কিন্তু সাদ্দাম ভাইয়ের শুকনা কথায় মন ভরে না। সোহাগ কইরা ডাইকা কয়, জানু তোমার পাখী দুইটারে দেখাওনা। একটু দেখি, আমারে দেইখা উড়াল দিতে পারে কিনা। ভাবীর কেমন জানি শরম শরম লাগে। প্রথমে একটু সংকোচ করে, পরে ফুরৎ কইরা ফুয়াদের চড়ুই পাখির মত ব্লাউজের বোতাম খুইলা বন্দী পাখি দুইটারে মুক্ত কইরা দেয়। তালের গোলক দুইটি মুক্তির আনন্দে একটু উথলে উঠে পুরো বুক জুড়ে এলিয়ে পড়ে। সাদ্দাম ভাই দেখে আর দেখে। তার মনসা লতাও দেখায়। লতারে যখন হাত উসকাইয়া দেখায় তখন এটি শক্ত হইতে থাকে, একটু কান্নি মাইরা ফুইল্লা উঠে। প্রেম-অভাবী দুই নর-নারীর মধ্যে এভাবে দেখাদেখি চলতে থাকে, একসময় সাদ্দাম ভাই চূড়ান্ত ঝাঁকুনি দিয়া ফোয়ারার মত আনন্দের মৃত্যূ ঘটায়। এই দৃশ্যের ছন্দে ছন্দে ভাবীর শীৎকার ধ্বনি ছোট্ট বাথরুমে ভেসে বেড়ায়। সাবধানি ভাবী তার আগেই কল খোলা রাখে, যাতে বাথরুমের বা্ইরে থেকে কেউ কিছু শুনতে না পারে, তাই আবহ সঙ্গীতে শুধু জলের শব্দ শোনা যায়। এইভাবেই প্রবাসীদের দাম্পত্য-জীবনে সাইবার যৌনতা ভালবাসার ফুল ফুটায়।

আরও পড়ুনঃ  বিদ্যাসাগরের দ্বি-শত জন্মবার্ষিকীতে চার খন্ডের রচনাবলী

ভাবীর ফোনটি অসাবধনাতায় লকড হয়ে যাওয়ায় আমারে ঠিক করতে দিছিল। তখন ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে ইমোতে রেকর্ড করা এই ছবিগুলি দেখি। আমি যে দেখছি এই কথাটাতো আর ভাবীরে বলা যায় না। বললে আর কখনো আমারে ফোনটা ধরতে দিবে না, আর তাছাড়া লজ্জাও পাবে। আবার না বললে যদি কোন কারণে অন্য কারো হাতে ফোনটা দেয়, তাহলে ছবিগুলো ভাইরাল হবে। এটাতো দেখি উভয় সংকট। তবে একটু চালাকির আশ্রয় নিলাম। ভাবীরে কইলাম, ভাবী তোমার এটা ব্রান্ডেড ফোন, খুব দামী, যার তার হাতে দিওনা, তাহলে ঠিক করার কথা বইলা ভাল পার্টসগুলো হাতাইয়া নিয়া পুরানো পার্টস লাগাইয়া দিবে। তাই হয় আমারে দিবা নয় সাদ্দাম ভাইরে, যদি তিনি দেশে থাকেন। হাজার মাইল দুরে থাইকা এই সদ্য বিবাহিত দম্পতির আর কিইবা করার আছে, ফোনালাপেই সব। প্রযুক্তিই অন্তত এদেরকে দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর সুযোগ করে দিছে। অন্তত অবদমনের কারাগার থেকে একটু হলেও খোলা বাতাসে মুক্তির শ্বাস নিতে পারে।

গলা নামাইয়া ভাবীরে ডাকি, ভাবী, ভাবী। নাহ, কোন জবাব নাই। এইবার গলা তুইল্যা ডাকি, ভাবী ও ভাবী, নাহ্, কোন জবাব আসে না। ঘরের কোনখানে না দেইখ্যা বাথরুমের দিকে যাই। বাথরুমের দরজাটা লাগানো। একটু নক করতে গিয়ে দেখি দরজার হুক লাগানো নাই। বাথরুমের হ্যান্ডেলে একটু জোরে চাপ দিতেই দরজা খুলে যায়। ভাবী সিটকানি লাগাইছিল কিন্তু সিটকানির বল্টুটা আংটার ভিতরে ঢুকে নাই। বল্টুগুলোও বাজে, চাইনিজ মাল, আংটায় ঢুকে না।

আমি ফুপুর ঘরে গিয়া বসি। একটু পরেই ফুপু আসে। কয়, ছলেমান তুই কি ঢাকা যাবি।

হ, যাব। কালকা সক্কাল সক্কাল বাইর অইয়া যামু।

তা ফিরবি কবে?

গরু বেচা হইয়া গেলে ঈদের আগে নয়ত ঈদের দিন।

ওমা, কি কস? বাড়ীতে ঈদ করবি না।

তৌফিকে থাকলে করব।

ঠিক আছে যা, তয় আমারে একটা হট ওয়াটার ব্যাগ আইনা দিস। কোমরের ব্যাথায় আর পারি না। সাদ্দাম যেইটা অনছিল, হেইটা লিক হইয়া গেছে। দাম কত পড়ব জানস?

ফুপু, আমার ধারনা নাই। এর মধ্যে ভাবী আসে, বলে, ভাই তুমি হাজার খানেক টাকা নিযা যাও, আমারও কিছু টুকিটাকি জিনিষ লাগব, আইনা দিও।

ছলেমান ভাই, এবার কুরবানীর বাজার কেমুন। হাটে গিয়া কি বুজলেন। ভাবী গামছা দিয়া বাঁধা চুলটারে নিঙড়াতে নিঙড়াতে আমারে প্রশ্নটা করল।

আমি এর মধ্যে চোরা চাউনিতে ভাবীর বুকের দিকে তা্কাইয়া কইলাম, ঢাকার বাজার ভালো না। এবার গরুর চাহিদাও কম। করোনার জন্য কল-কারখানা, দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ ছিল। ক’দিন আগে আধাআধি খুলছে। অনেক মাইনষের চাকুরীও নাই। চাকুরি থাকলেও অনেকের বেতন বন্ধ, অনেকেরে অর্দ্ধেক বেতন দেয়। ছোট খাট ব্যবসা যারা করত তারও পথে বসেছে। অনেকে পুঁজি হারাইয়া গ্রামের বাড়ীতে ফিরা গেছে। মানুষের হাতে টাকা নাই। তাই এইবার গরুর চাহিদা নাকি অনেক কম। দামও কম।

এখন বাকীটা ভাগ্যের উপর ছাইড়া দিছি, ভাবী। ফুপু আর আপনার দোয়ার বরকতে যদি গরুগুলো বেইচ্যা খরচের টাকাটা তুলতে পারি, এই আশায় রইলাম।

গেলাম ভাবী। এখন সোহেল ভাইয়ের কাছে যামু। সোহেল ভাই কয়টা গরু নিয়া ঢাকা গেছিল, কালকা ভোর রাইতে ফিরছে। হের কাছ থেকে বাজারের খোঁজ খবর নিতে হইব।

বুকের আঁচলটা অকারণে টানতে টানতে একদিকের বাটি উদোম কইরা ভাবী উদাস গলায় কইল, ঠিক আছে ভাই, যাও। চিন্তা কইরো না, যা হবে ভালই হবে।

আমি মনে মনে কই, আমার মরণ হইলে হেইটাও কি ভাল হইব।

সোহেলরে ফোন দিছি, রিঙ হয়, ধরেনা। দুইবারের পর সোহেলের বউয়ে ধরছে। কইল, ভাই, আপনার সোহেল ভাই ভোর রাইতে আইছে, অহন একটু ঘুমাইতেছে, আপনারে বিকাল বেলা হাটে দেখা করতে কইছে।ঘরে বইসা থাকা যায় নাকি। দুপুরে দুইটা খাইয়াই রাওনা দিলাম। রতনের দোকানে গিয়া বইলাম।

আরও পড়ুনঃ  জন্মদিনে স্মরি চারণ কবি বিজয় সরকারকে

রতন, কেমুন আছস?

ভাল আছি, ছলেমান ভাই। তা গরু নইয়া ঢাকা যাইবেন কবে?

কালকে যামু। তুই আমারে ডবল লিকার দিয়া এক কাপ কড়া চা দে।

চা শেষ করার আগেই সোহেল ভাইও আসে। চা চলব সেহেল ভাই।

মন্দ হয় না।

এবার কন সোহেল ভাই, বাজারের হাল হাকিকত কি রকম?

সোহেল ভাই চায়ে একটা আয়েশি চুমুক দিয়া কয়, আমি যখন গেছিলাম তখন তো বাজার মেলে নাই, শহরের লেকেরা গরু রাখার জায়গার অভাবে ঈদের ৩/৪ দিন আগে থেকে গরু কেনে। তাই তোরা গিয়া ভাল বাজার পাবি বলে মনে হয়। তবে দেশের অবস্থা ভালা নারে। এই করোনা বাতাস সব কিছু বন্ধ কইরা দিয়া গেছে। তারপরও দেখ, আশা রাখ।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে, ছলেমান, তুই মাষ্টারী করতে ছিলি, তোরে কোন পোকা ধরল যে একেবারে গরু মোটা তাজা করণ প্রকল্পে হাত দিলি।

সোহেল ভাই, সবাইতো দুইটা উপরি রোজগারের চেষ্টা করে। আর তাছাড়া আমার ছাত্রের বাবা পশু পালন অফিসার. তিনি বল্লেন তিনি সাহায্য সহযোগিতা করবেন। তাই তার ভরসায় মাত্র তিনটা গরু নিয়ে শুরু করলাম্। এই আর কি। এখন আপনাদের দোয়ায় খরচের টাকা তুলতে পারলে হয়, পারবো তো?

দেখ, এবার ঢাকার অনেক হাট সরকারে বসতে দেয় নাই। যে কয়টা বসেছে তাতে গত কযদিনে কাষ্টমার খুব কম দেখেছি। কাষ্টমার না থাকলে দাম উঠবে কেমনে? তবে শেষের দু-এক দিনে বাজার একটু তেজী হতে পারে।

তা এবার তুমি কেমন ব্যবসা করলা? আমি উদগ্রীব হইয়া জানতে চাইলাম।

ব্যবসা অর্থে ব্যবসা হয় নাই। লোনের টাকাটা শোধ দিতে পারলেই চলবে। ব্যবসা আগামীবার করব, ইনশাল্লাহ্।

সোহেল ভাই, মন খারাপ করা নিউজ দিলা। মনটা ভাইঙ্গা গেল।

অহনি মন ভাঙ্গার কি আছে, আরো পাঁচ দিন আছে, বাজার বদলাইতে কতক্ষণ? কুরবান অনেকের উপর জায়েজ না হইলেও অনেকে মান-সম্মান বজায় রাখার জন্য এদেশে ধার কইরা হইলেও কুরবানী দেয়। আর তাছাড়া, বড় লোকের ভাণ্ডারে তো টান পড়ে নাই। ট্যাহা নাই খালি গরীবের হাতে, কিন্তু বড় লোকের হাতে বেশুমার ট্যাকা। কমপিটিশন দিয়া কিনব।

ভাই, আমার মালতো লাখের রেইঞ্জে। প্রথম দিকে বুঝতে না পাইরা খরচও বেশী কইরা ফালাইছি, চালানটা উঠবে তো?

তুই ভাবিস না। তোর লস হবো না। হয়ত লাভের পরিমাণটা একটু কম হবে। তাছাড়া তোর সরকারী স্কুলের মাষ্টারীর স্থায়ী চাকুরী আছে। লস হইলেও পোষায়া নিতে পারবি। তয় আমি কইলাম, এইবার তোর এবার লস হবে না।

সামনে আলমের দোকানে পিয়াজু ভাজতেছে। কিছু মচমচে পিয়াজু আনা।

রতন তোর পোলটারে দিয়া বিশ টাকার পিয়াজু আনাইয়া দে, সব বিল একসাথে দিমুনে।

সোহেল ভাই মুঠো ভইরা পিয়াজু নেয়। আমি একবারে একটা নিতে নিতে সোহেল ভাই তিনটা নিয়া নেয়। আমি দুইটা খাইতে খাইতে সব পিয়াজু শেষ। সোহেলভাইদের মত মানুষ কোন কিছুতে ফাঁক রাখে না, যেরকম হাতের মুঠোয়, আমার একটার পাশাপাশি সেহেল ভাই তিনটা তোলে। ব্যবসায়ী হলে এরকমই হইতে হইব। কোন ফাঁক রাখা চলবে না।

সোহেল ভাইয়ের অভয়বাণী সত্বেও মনের মধ্যে কেমন একটা খচ্ খচ্ করতে থাকে।

তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া দাওয়া সাইরা শুইয়া পড়ি।ঘুমটা একটু দেরীতে আসে।

ফজরের আযানের আগে ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। কালকে হাটে গিয়া মোমেনরে কইয়া রাখছিলাম। সে রাজী হইছে। তিন দিনে খাওয়াদাওয়া ছাড়া কত দিমু জিজ্ঞাস করায় সে কইল ভাই আমি আর কি কমু। আমিতো এখন বাড়ীতে এমনি বইসা রইছি, চলেন দুই ভাই একলগে মিইল্যা যাই। আগে আপনার ব্যবসা হোক।

আরে পাগল আমার ব্যবসা হোক আর না হোক তোর প্রাপ্যটাতো বলবি।

আমি কি কমু। আপনি যা ভাল মনে করেন, করবেন। আর আপনি কি আমার জন্য খারাপ করবেন।

ঠিক আছে, কালকে ফজরের আযানের পর বাড়ীতে আসবি। ট্রাকওয়ালকে বলা আছে, ওরা বড় রাস্তায় ছয়টার দিকে রেড়ী থাকবে।

আমরা সোজা ঘন্টা তিনেকের মধ্যে আফতাব নগর হাটে পৌঁছে যাই। কিয়ের হাট, ঢুকতে সব দর-দালান। তারপর ফাঁকা মাঠে দালান-কোঠার মাঝে মধ্যে গরুর হাট। ঢোকার মুখে লাল গরুর ছবি দেযা বড় গেট। মাঠে বাঁশ বান্ধা। বাঁশের সাথে গরু বন্ধা। বেপারীদের মুখে মাস্ক লাগানো। অনেকের নাই। তবে সবাই নাকটারে খোলা রাখছে। অনেকে নাক, ঠোঁট দুইটাই খোলা রাখছে।

মোমেন কাজের ছেলে। গরুগুলোরে নামাইয়া বাঁশের খুঁটির সাথে বাইন্ধা ফালাইছে। এক জন দুই জন কাষ্টমার আসতাছে। আমি দাম চাইলাম একটার নব্বই। আর একটা একশত বিশ। কাষ্টমারে কয়, নব্বইটারে ষাট, একশত বিশটারে পচাশি। বুঝলাম। আজকে দেখতে হইব। কালকের অবস্থার উপর ব্যবস্থা।

ঘুমানোর একটা ব্যবস্থা হইছে। সারা শরীরে প্রচন্ড ক্লান্তি। গায়ের জামাটা খুইলা সোজা মশারীর ভিতর। তেল চিটচিটে বালিশে মাথা দিতে না দিতেই এক পশলা ঘুম। বেঘোর।

আরও পড়ুনঃ  বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন ১০ কবি ও লেখক

আমি এখন ক্লাস রুমে। আমাদের নতুন অধ্যাপক এসেছেন। ইনি আজকে আমাদেরকে সিনথেটিক বায়োলজি পড়াবেন। তাঁর বাড়ী উখিয়া, কক্সবাজার। নামটি ভারী মিষ্টি, রাধিকা রমণ চৌধুরী।

আমাদের কাছে বিষয়টি নতুন, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে নয় রাধিকা রমণকে নিয়ে আমাদের যত আগ্রহ। তাই যা হবার তাই হল, শ্রেণীকক্ষে ঠাঁই নাই। ছেলেদের সাথে মেয়েদের উৎসাহও কম নয়। এটার ব্যাখ্যা দিল আমাদের আবু ইউসুফ ভাই, তিনি বল্লেন, উনার নামে সাথে যে রমণ শব্দটি আছে তাতে মেয়েদেরও উৎসুক্য বেশী বই কম নয়।

রাধিকা ক্লাসে এলেন। ত্রি এম প্রোজেক্টরটা প্লাগ ইন করা হল। তিনি ডায়েসে দাঁড়িয়ে নিজের সংক্ষিপ্ত কিন্তু আকর্ষণীয় পরিচয়টি দিলেন। এরপর একটু ভূমিকা দিয়ে শুরু করে মূল পর্বে এলেন।
গরু খায়।

মানুষও খায়।

গরু জবর কাটে।
মানুষও স্মৃতি রোমন্থন করে।

এরকম মিল অমিল নিয়ে প্রাণী জগৎ। মানুষের চিন্তন জগতের উৎকর্ষতায় আজ চিকিৎসা বিজ্ঞান শুধু মানুষের কল্যাণে নয়, অন্য প্রাণীদের কল্যাণেও নিয়োজিত। মানুষ স্বপ্ন দেখে। আন্য প্রাণী স্বপ্ন দেখে কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে মানুষ ব্যতিত অন্য কোন প্রাণীর যে স্বপ্ন দোষ হয় না এ বিষয়ে মানবকুলের বিতর্কপ্রিয় বিদগ্ধ পণ্ডিতবর্গ একমত।

রাধিকা জানালেন, বংশগতি বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে গরুদের স্বপ্ন দেখানো সম্ভব হলেও তাদের তা দেখানো অনেক দিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। বিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী আবিস্কারটাকে শুধুমাত্র তথাকথিত মানবিকতার নৈতিকতার দোহাই দিয়ে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন আমরা গ্রহ পৃথিবীর সকল প্রাণীর বিষয়টাকে মাথায় রেখে কাজ করি। এখন আর আমরা মানবিকতা বলি না, এটা একপেশে। বরং আমরা বলি প্রাণবিকতা। যুক্তির আলোকে না দেখে মধযুগীয় অজ্ঞানের তন্ত্র-মন্ত্র ধারনাপ্রসূত এখনো কতিপয় ভুখন্ডে মানুষ কোন বড় নির্মাণ বা উদযাপনে অকাতরে প্রাণী বিনাশ করে, যা আমাদের ইকো-সিষ্টেমকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। এতে আমাদের প্রিয় গ্রহ অকালে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের পাইলট প্রকল্পে এরকম কতিপয় চতুষ্পদিকে স্বপ্ন দেখিয়ে মোটিভেট করা হয়েছিল। এরপর গবেষকবৃন্দ এদের উপর গভীর পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান, একটি হাটে জড়ো করা গরুগুলিকে মোটিভেশনাল স্বপ্ন দেখালে একপর্যায়ে তারা ভীষণ ছটফট করে তেড়েফুঁড়ে উঠে, সব তছনছ করে, হাটের খুঁটি ভেঙ্গে ব্যাপারীদের ধাওয়া দেয়, এবং অবশেষে তারা মুক্তির আনন্দে ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর গবেষকরা দ্রোহী গরুদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে যে রিপোর্ট পান, তাতে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে উদ্বেগজনক হল, গরুর রক্তের মধ্যে টক্সিসিটির পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার অনেক উপরে। যার ফলে, এটা মানুষের খাদ্য চক্রে ঢুকে মানব জেনোমকে প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এ বিষয়ে EHO (Earth Health Organization) এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, কোন গণ গরুনিধন যজ্ঞ করা যাবে না। আর যে সব গরু মানুষের খাওয়ার জন্য খামারে উৎপাদন করা হবে সে সব গরুকে স্বাপ্নিক করে গড়ে তোলা যাবে না। স্বপ্ন বিষয়টা প্রাণবিক হওয়া সত্বেও একান্তভাবে মানুষের থাকা উচিত, সেই সাথে স্বপ্ন দোষটাও।

তারপর রাধিকা ম্যাম ল্যাবে ফিরে ড্রিমোটগ্রাফার (যে যন্ত্রে স্বপ্ন ধারন করে রাখা হয়) যন্ত্রটি রিওয়াইন্ড করে আমাদেরকে ভিডিওটি দেখাল, গরুগুলি সব শক্ত-পোক্ত বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় ঘাস-বিচালী-খড় চিবুতে চিবুতে খাচ্ছিল। এভাবে রাত পার হয়ে আস্তে আস্তে প্রত্যুষ নেমে আসে, চরাচর আঁধার কাটিয়ে আলোকিত হতে থাকে। সূর্যের বিপরীত প্রান্ত থেকে এক আপাদ-স্কন্ধ শুভ্র পোষাকধারী শশ্রুমন্ডিত যৌবনদীপ্ত মানব চকচকে কৃপাণ হাতে উঁচিয়ে, বেধে রাখা গরুদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তার চোখে কতলের সুরমা টানা। সময়টা ছিল বিশেষ এক যজ্ঞ উৎসব শুরুর মহেন্দ্রক্ষণ। চারিদিকে শত শত গরু দড়ি দিয়ে বাঁধা। তথন নাঙ্গা তালোয়ার হাতে অগ্রসর যৌবনদীপ্ত মানুষটিকে দেখে এক পর্যায়ে গরুরা সংঘবদ্ধ হয়, পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ হয়। কঠিন সঙ্কল্প গ্রহণ করে। কৌশল নির্দ্ধারণ করে। গরুতার জ্ঞানের আলোকে শুধু গরু নয় পৃথিবী নামক গ্রহের সকল প্রাণীকুলের কল্যাণে এগিয়ে যাবার শপথ নেয়। তারপর, গরুগুলি হঠাৎ পিছন ঘুরে ভো দৌড়। প্রায় সুপারসনিক গতিতে দৌড়। এরপর গরুগুলি যখন থামল, তখন বিষণ্ণ বিকেল। ব্রিলিয়েন্ট-ব্লু ছেহাই লেপ্টানো হালকা নীলচে আকাশ ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসছে। দুর থেকে ভেসে আসছে গরম আর আদ্র আবহাওয়ার কষাঘাতে ক্লান্তির রেশ লেগে থাকা কণ্ঠের কোন এক মুয়াজ্জীনের সুমধুর আযানের ধ্বনি। আর তার সাথে স্পার্টাকাসের দ্রোহের হুঙ্কারের মত ধাবমান গরুদের গগনবিদারী নিনাদ।

এই প্রচন্ড আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায। আমি হুড়মুড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়ি। দৌড়ে গিয়ে দেখি, আমার গরুগুলি বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা। ঘটনার আকস্মিকতায় একটু বিহ্বল হলেওে রোমাঞ্চিত হই এই সুন্দর স্বপ্নটার জন্য। মোমেন হাসছে। ভাই, বাজারে গরু কম। কিন্তু কাষ্টমার বেশী।

আমিও মুখ টিপে হাসি, তবে ব্যবসার জন্য নয়। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত রাধিকাকে দেখতে পাওয়ার জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সংবাদ সারাবেলা